
হামজা চৌধুরীর আগমনে বাংলাদেশে বেড়েছে ফুটবল উন্মাদনা। বিশেষ করে জাতীয় দলকে ঘিরে। গত বছর ঘরের মাঠে প্রায় প্রতিটি ম্যাচের গ্যালারি ছিল পরিপূর্ণ। ২২ বছর পর ভারতকে হারানোর স্বাদ বাংলাদেশ পেয়েছে এই সময়েই। তবে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্ব পার হতে না পারার আক্ষেপটাও রয়ে গেছে। সেই সঙ্গে অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে একটা শিরোপা জয়ের। যে স্বপ্নটা এখন লাল সবুজের সমর্থকেরা দেখছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরে। এ বছরই হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ-খ্যাত এই প্রতিযোগিতা। সেটি বাংলাদেশে আয়োজন করা গেলে অন্তত তিনটি ভেন্যুতে করতে চান বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল।
২০০৩ সালে সাফ জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর কোনো শিরোপা জিততে পারেনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৩ সাফে দৌড় ছিল সেমিফাইনাল পর্যন্ত। সাফের পরবর্তী আসর হওয়ার কথা ছিল গত বছর। তবে তা এ বছর গিয়ে ঠেকেছে। যদিও সূচি ভেন্যু কিছুই ঠিক হয়নি। শোনা যাচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বরে সাফের টুর্নামেন্ট মাঠে গড়াতে পারে।
সাফ নিয়ে সবকিছুই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে আয়োজক হলে তিন ভেন্যুতে সাফ আয়োজন করতে চায় বাফুফে। গতকাল সোমবার এমনটাই জানিয়েছেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। বাফুফে ভবনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাফ নিয়ে প্রথমে আমরা প্রস্তুত এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সাফ সম্ভবত আমরাই আয়োজন করব। এটা আয়োজন করার ভিশন একটাই, পুরা বাংলাদেশে খেলাটা ছড়িয়ে দিতে দেওয়া। সেখানে আমরা চাই, কমপক্ষে তিনটা ভেন্যু যেন আমরা ব্যবহার করতে পারি। ঢাকার বাইরে থাকবে দুটো ভেন্যু। তাহলে টুর্নামেন্টটা জাঁকজমকপূর্ণ হবে। আলোচনা এখনো চলমান।’
সাফ টুর্নামেন্ট ঢাকায় আয়োজন হলে ভারত খেলতে আসবে কি না সেই প্রশ্ন আগেভাগেই উঠছে। এমন প্রশ্নে বাফুফে সভাপতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি মনে করি না, ফুটবলে আমরা অন্য কোনো বিবেচনা মনে রাখি। নভেম্বর মাসেও আমাদের প্রতিবেশি (ভারত) দেশ খেলে গিয়েছে। গত মার্চে আমরা গিয়েছিলাম খেলার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, ফুটবল ফুটবলের মতোই চলবে।’
গতকাল বাফুফে ভবন পরিদর্শনে আসেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। আলোচনায় অবশ্য প্রাধান্য পেয়েছে ফুটবলের জন্য ‘ডেডিকেটেড’ স্টেডিয়াম। ফুটবলের জন্য ফিফা টায়ার-১ ক্যাটাগরির স্টেডিয়ামে মূলত দেশে আছে দুটি- বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা ও জাতীয় স্টেডিয়াম। জাতীয় স্টেডিয়ামে অবশ্য ফুটবলের বাইরে আর্চারি, অ্যাথলেটিক্সসহ অন্যান্য খেলাও অনুষ্ঠিত হয়।
শর্তসাপেক্ষে তিনটি স্টেডিয়াম ফুটবলের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা বিষয়ে আমরা উনাদের (বাফুফে) দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছি। একটা হচ্ছে ঢাকা স্টেডিয়াম যেটা আছে, এটা সম্পূর্ণভাবে ফুটবলকে দিয়ে দেওয়া। তবে অন্যান্য যে খেলাধুলা আছে ক্রিকেট ছাড়া, তাদের আয়োজনের প্রয়োজন হলে সেখানে আয়োজন করবে। যদি তারা অন্য কোথাও...উদাহরণসরূপ পূর্বাচল স্টেডিয়াম বা অন্য কোথাও যদি তারা জায়গা পেয়ে সরে যায় তখন এটা সম্পূর্ণ ফুটবলের হয়ে যাবে।’
No posts available.
১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪০ এম

কানাডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্যাভালরি এফসির সঙ্গে অধ্যায়ের ইতি টানলেন সোমিত সোম। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মিডফিল্ডারকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ক্লাবটি।
সামাজিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতিতে লিখেছে, ‘ক্যাভালরি এফসি নিশ্চিত করেছে যে মিডফিল্ডার শমিত শোমে ২০২৬ মৌসুমে ক্লাবে ফিরে আসবেন না। ক্লাব তার কঠোর পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে সর্বোত্তম শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।’
সোমিত সোম ২০১৬ সালে কানাডার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ৭টি ও ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেছেন ৪টি ম্যাচ। ২০২০ সালে কানাডার জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেন দুটি ম্যাচ।
সবশেষ গত বছরের ১০ নভেম্বর অ্যাথলেটিকো ওতাওার বিপক্ষে কাভালরি এফসির হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেন সোমিত। কানাডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ক্লাবটির মৌসুমে শেষ ম্যাচটি হয়ে থাকল সোমিতেরও শেষ ম্যাচ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ক্যাভালরি এফসিতে যোগ দেন তিনি। এই ক্লাবের জার্সিতে খেলেছেন মোট ৭৯টি ম্যাচ। এই সময়ে ক্লাবের হয়ে তিনি সিপিএল শিল্ড এবং নর্থ স্টার কাপ জয়ের গৌরবও অর্জন করেছেন।
কানাডার ক্লাব ফুটবলের অধ্যায় শেষ করার পর সোমিতের পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, তা নিয়ে এখন দেশের ফুটবল অঙ্গনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের হয়ে গত বছরের জুনে অভিষেক হয় সোমিত সোমের। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের ম্যাচে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বাংলাদেশের জার্সিতে প্রথম মাঠে নামেন তিনি। লাল-সবুজের জার্সিতে জাতীয় দলের মাঝমাঠের অন্যতম ভরা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সোমিত।

বহু জল্পনা-কল্পনার পর শেষ হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে জাবি আলোনসোর সাত মাসের অধ্যায়। বহিষ্কার হওয়ার গুঞ্জন ছিল বেশ কদিন ধরেই। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে এল ক্লাসিকোতে হারের একদিন পর আসে ঘোষণা। স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যমের খবর, ধারাবাহিকতা আর ছন্দের অভাব ছাড়াও দলে তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে রেষারেষির কারণেই মূলত এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কোচের বিদায়ের ঘোষণার পর সান্তিয়াগো বার্নাব্য’এর ফুটবলারার জাবির উদ্দেশ্যে বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সাবেক হয়ে যাওয়া জাবিকে উদ্দেশ্য করে আবেগঘন বার্তা দেন এমবাপে। ফরাসি তারকা এই ফরোয়ার্ড বলছেন যে তাদের পথচলা সংক্ষিপ্ত ছিল, তবে আলোনসোর প্রভাব দলের ওপর স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে।
এমবাপে লিখেছেন, ‘সময়টা যদিও ছোট ছিল, তবে আপনার জন্য খেলতে পারা এবং আপনার কাছ থেকে শেখা সত্যিই আনন্দের ছিল। প্রথম দিন থেকেই আমাকে আত্মবিশ্বাস দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি আপনাকে মনে রাখব এমন একজন ম্যানেজার হিসেবে, যার স্পষ্ট ধারণা ছিল এবং ফুটবল সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতেন যিনি। আপনার পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য শুভকামনা।’
রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি মিডফিল্ডার অরলিয়েন চৌআমনি আলোনসোকে ‘সর্বোৎকৃষ্ট কোচদের একজন’ হিসেবে উল্লেখ করলেন। আর আর্দা গুলের একটি আবেগঘন বার্তা শেয়ার করলেন, যেখানে কোচের তার উন্নয়নে প্রভাব তুলে ধরা হয়। তুর্কি এই মিডফিল্ডার লিখেছেন, ‘প্রতিটি আলাপ, সব খুঁটিনাটি, প্রতিটি অনুরোধ আমাকে আমার খেলার মান উন্নয়নে সাহায্য করেছে। আপনার বিশ্বাস আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় বানিয়েছে। আপনার প্রভাব চিরকাল আমার সঙ্গে থাকবে।’
স্প্যানিশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপার কাপের ফাইনালের শেষে ‘গার্ড অব অনার’ কাণ্ডেই নাকি বেশ মণক্ষুণ্ণ হয়েছেন জাবি। চ্যাম্পিয়ন বার্সাকে সম্মান জানানোর প্রথা হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ কিলিয়ান এমবাপে-ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের গার্ড অব অনার দিতে বলেছিলেন। কিন্তু জাবির সেই নির্দেশনা না মেনে উল্টো সতীর্থদের নিয়ে ড্রেসিংরুমের পথ ধরেন এমবাপে। আর শিষ্যের এমন কাণ্ডেই নাকি জাবির রিয়াল ছাড়ার সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
গুঞ্জন ছিল লস ব্লাঙ্কোসের তারকা ফুটবলাররা জাবির কোচিংয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র তো প্রকাশ্যেই স্প্যানিশ এই কোচের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। জাবি থাকলে চুক্তি না নবায়ন না করারও হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। তাতে ক্লাবের ভেতরে বাহিরের সব চাপ সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে জাবির জন্য।
স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাবটি নতুন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সাবেক ডিফেন্ডার আলভারো আরবেলোয়াকে। জাবির বিদায়ের পরপরই নতুন কোচের নাম ঘোষণা করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালের জুন থেকে রিয়ালের ‘বি’ দল রিয়াল মাদ্রিদ কাস্তিয়ার কোচ হিসেবে কাজ করছিলেন আরবেলোয়া।

দুই দলের স্টেডিয়াম একেবারেই লাগোয়া। এই মৌসুমেই ফরাসি লিগে উঠে এসেছে তারা। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের নগরপ্রতিদ্বন্দ্বি ক্লাব প্যারিস এফসির ফুটবলার জোনাথন ইকোনে। পিএসজিতে ফুটবলের হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর। এবার সাবেক এই ক্লাবেরই হতাশার কারণ হলেন ইকোনে।
গতকাল রাতে ফ্রেঞ্চ কাপের শেষ ৩২’এ পিএসজিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমকে দিয়েছে প্যারিস এফসি। আর ফরাসি জায়ান্টদের বিদায় করে দেওয়া একমাত্র গোলটি আসে তাদেরই সাবেক ফুটবলার জোনাথন ইকোনের নৈপুণ্যে। নিজেদের মাঠে পার্ক দে প্রিন্সেসেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
গত ৫ জানুয়ারি লিগে প্যারিস এফসির মুখোমুখি হয়েছিল পিএসজি। লিগে প্রতিবেশীদের ২-১ গোলে হারালেও ফ্রেঞ্চ কাপে ধরাশায়ী হলো লুইস এনরিকের ক্লাব। ২০১৪ সালের পর এই প্রতিযোগিতায় শেষ ৩২’ থেকে বিদায় নিল পিএসজি।
পিএসজির তুলনায় প্যারিস এফসির ঘর একেবারে শূন্যই বলায় চরে। শক্তিমত্তা কিংবা সাফল্য কোনো দিক থেকেই ধনী প্রতিবেশীর ধারেকাছেও নেই ক্লাবটি। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবের ইতিহাসে এখনো বলার মতো কোনো অর্জনও নেই। বর্তমান দলে নেই কোনো তারকা ফুটবলারও। অথচ এই দল নিয়েই বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দলকেই রুখে দিল তারা।
আরও পড়ুন
| কে এই রিয়াল মাদ্রিদের নতুন কোচ আরবেলোয়া |
|
ফ্রেঞ্চ কাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ১৬বারের চ্যাম্পিয়ন পিএসজি ঘরের মাঠে বেশ দাপটই দেখিয়েছিল। ৭০ শতাংশ বল নিজেদের কাছে রেখে মোট ২৫টি শট নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখে স্বাগতিকরা। তবে কাজে লাগাতে পারেনি কোনো সুযোগই। ডার্বি ম্যাচে প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণের কাছে হার মানতে হয়েছে পিএসজিকে। যেখানে মাত্র চারটি শট নিয়েই শেষ হাসি হাসে প্যারিস এফসি।
ম্যাচের প্রথমার্ধে তেমন বড় কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বল পজিশনে এগিয়ে থাকলেও প্রতিপক্ষের বক্সে সুবিধা করতে পারছিল না পিএসজি, আর প্রতিবেশির আধিপত্যের মধ্যে শৃঙ্খলাবদ্ধ আর সুসংহত ছিল প্যারিস। বিরতির আগে সবচেয়ে বড় সুযোগ পেয়েছিল পিএসজি। তবে খাভিচা কাভারেস্কেলিয়ার নেওয়া শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন সফরকারী দলের গোলকিপার ওবেদ এনকামবাদিও। ম্যাচে রীতিমতো প্রাচীর হয়ে যাওয়া এই গোলকিপার মোট সাতটি সেভ করেন।
বিরতির পর পিএসজি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কয়েকটি দারুণ সুযোগও তৈরি করে। তবে পিএসজির একের পর এক আক্রমণ সামলে দ্রুত এক প্রতি আক্রমণ থেকে আঘাত করে প্যারিস এফসি। ৭৪ মিনিটে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দেওয়া গোলটি করেন জোনাথন ইকোনে।
এরপর আরও সুযোগ এসেছিল পিএসজির। হতাশার রাতে তাদের পাশে ছিল না ভাগ্যও, একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। পিএসজির ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা আর প্যারিস এফসির গোলকিপারের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক এক জয় নিয়েই ফ্রেঞ্চ কাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে প্যারিস এফসি।
জয়সূচক গোল করা উচ্ছসিত ইকোনে ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমরা সত্যিই খুশি, আমরা ভালোভাবে রক্ষণভাগ সামলেছি। আমার গোলের জন্য আমি খুবই খুশি, এটি এক আনন্দময় মুহূর্ত, এবং আশা করি এটি আমার শেষ গোল হবে না।’

এক একটি হারে বাড়ছিল চাপ। ড্রেসিংরুমে চাপা উত্তেজনার গুঞ্জন চলছিল অনেকদিন। দলের তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না। সব মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউট থেকে জাবি আলোনসোর বিদায়টা যেন অবধারিত হয়ে ওঠে। গতকাল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে নিজের সাবেক ফুটবলারের সঙ্গে স্প্যানিশ জায়ান্টদের সংক্ষিপ্ত পথচলা। এবার আলোচনায় রিয়ালের নতুন কোচ।
আলভারো আরবেলোয়া—এক সময় রিয়াল মাদ্রিদের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার, আর এখন ক্লাবের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর। রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি কাস্তিয়ার কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ইউরোপের সবচেয়ে সফল ক্লাবটির কোচিং কাঠামোয় তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০/২১ মৌসুমে, ইনফান্তিল দলের হাত ধরে। এরপর ধাপে ধাপে ক্যাডেট, জুভেনীল ওকাস্তিয়া থেকে এখন রিয়ালের মূল দলের ডাগআউটে।
কাস্তিয়ায় আসার আগে জুভেনীল পর্যায়ে ৪২ বছর বয়সী আরবেলোয়ার অর্জনগুলো ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২২/২৩ মৌসুমে তিনি জুভেনীলকে এনে দেন ঐতিহাসিক ট্রেবল। শুধু তাই নয়, তিন বছরে দুইবার লিগ শিরোপা জয় এবং ট্রেবল জেতা সেই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থাকা—সবকিছুই ছিল রেকর্ডবইয়ের পাতায় লেখার মতো।
একজন খেলোয়াড় হিসেবে আলভারো আরবেলোয়া সবচেয়ে বেশি পরিচিত রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্যেই। তবে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়াও তিনি আরও কয়েকটি ক্লাবের জার্সিতে খেলেছেন। তাঁর ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল জারাগোসার যুব দলে, ১৮ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমিতে। মূল দলে সুযোগ পাওয়ার পর ২০০৬ সালে তিনি মাদ্রিদ ছেড়ে স্পেনের গ্যালিসিয়ান ক্লাব দেপোর্তিভো লা কোরুনিয়ায় পাড়ি জমান এবং সেখানে এক মৌসুম খেলেন।
পূর্বসূরি জাভি আলোনসোর মতোই এরপর আরবেলোয়া ইংল্যান্ডে চলে যান এবং লিভারপুলে যোগ দেন। অ্যানফিল্ডে তিনি কাটান মাত্র দুই বছর, তবে এই সময়েই ২০০৬/০৭ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে খেলেছিলেন। পরবর্তীতে আরবেলোয়া আবার রিয়াল মাদ্রিদে ফিরে আসেন এবং পরবর্তী সাত বছর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে কাটান। এই সময়ে তিনি একটি লা লিগা শিরোপা এবং দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বাদ পান।
ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে তিনি আবার প্রিমিয়ার লিগে ফেরেন। ২০১৬/১৭ মৌসুমে ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের হয়ে তিনি চারটি ম্যাচ খেলেন, এখানেই তার খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি ঘটে।
আরও পড়ুন
| তিন ভেন্যুতে সাফ আয়োজন করতে চায় বাংলাদেশ |
|
কোচিং ক্যারিয়ারে ট্রফির চেয়েও আরবেলোয়ার বড় অবদান এসেছে অন্য জায়গায়। এই কোচের হাত ধরেই রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ প্রতিভা বিকাশের কাঠামোর জন্য একটি কার্যকর সিস্টেম গড়ে উঠেছে। রিয়ালের একাডেমি কাস্তিয়ার প্রতিভাদের বড় একটা অংশই এসেছে আরবেলোয়ার তৈরি কাঠামো থেকে।
প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ভেতরের প্রতিভা বের করে আনা আরবেলোয়ার কোচিং দর্শনের অন্যতম মূল স্তম্ভ। প্রতিটি খেলোয়াড়কে আলাদা করে সময় দেওয়া, তাদের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কাজ করা এবং শক্তিমত্তা আরও শাণিত করে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি।
আরবেলোয়ার ফুটবল দর্শন খুব স্পষ্ট—পজেশন ধরে রাখা, ম্যাচের ছন্দ আর গতি নিয়ন্ত্রণ করা, পিচে পুরোটা সময় সচল থাকা, সংগঠিত প্রেসিং এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা। ৪-৩-৩ কিংবা ৩-৫-২—দুই ফরমেশনেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রিয়ালের সাবেক কোচ কার্লো আনচেলত্তির মতোই আরবেলোয়া মাঠে খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেন।
রিয়াল মাদ্রিদের আরেক সাবেক কোচ হোসে মরিনহো থেকেও দীক্ষা নিয়েছেন আরবেলোয়া। ২০২৩ সালে ‘কোচেস ভয়েজ’ এর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তিনি মরিনহোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। পর্তুগিজ এই কোচকে নিয়ে তিনি ছিলেন ভীষণ প্রশংসামুখর এবং মরিনিওর নিখুঁত, আপসহীন কোচিং স্টাইলের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
আর্বেলোয়া বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি তাঁর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পেরেছিলাম, কারণ তিনি আমাকে যেসব মূল্যবোধ শিখিয়েছেন। প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়া এবং উদাহরণ তৈরি করে কাজটা করা—এই ব্যাপারগুলো। হোসের অধীনে খেলতে হলে ট্রেনিংয়ে শতভাগ দিতে হতো, খেলোয়াড়ের নাম বা পরিচয় যাই হোক না কেন। এই মূল্যবোধ আর আদর্শগুলোর সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত ছিলাম।’

রিয়াল মাদ্রিদে সাত মাসের বেশি স্থায়ী হলো না জাবি আলোনসোর চাকরি। ক্লাবটির প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। রোববার রাতে স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে ৩-২ গোলে হার কারণে সমঝোতার মাধ্যমে আলোনসোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাবটি।
২০২৫ সালের ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়ালের মাদ্রিদের দায়িত্ব নেন আলোনসো। এর আগে বায়ার লেভারকুসেনের কোচ হিসেবে তিনি কাটিয়েছেন দারুণ এক সময়। ২০২৩–২৪ মৌসুমে লিগ ও কাপ জিতে ঘরোয়া ডাবল পূর্ণ করার পাশাপাশি ইউরোপা লিগের ফাইনালেও দলকে তুলে এনেছিলেন তিনি। রিয়ালের কোচ হিসেবে শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক। ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার পর প্রথম ১৪ ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতেই জয় পায় লস ব্লাঙ্কোসরা।
গত ৪ নভেম্বর লিভারপুলের কাছে পরাজয়ের পর থেকেই আলোনসোর দলের পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ে। পরবর্তী ৮ ম্যাচে মাত্র দুটিতে জয় পায় রিয়াল। যদিও পরে টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আলোনসো দল, কিন্তু তা ক্লাব কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গতরাতের এল ক্লাসিকোয় পরাজয়টাই আলোনসো অধ্যায়ের ইতি টানে।
এক বিবৃতিতে রিয়াল মাদ্রিদ জানায়, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান কোচ হিসেবে ক্লাবে আলোনসোর দায়িত্বের ইতি টানার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি একজন ফুটবলার হিসেবে আলোনসো সবসময় ক্লাবের মূল্যবোধকে ধারণ করেছেন এবং সমর্থকদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তিনি চিরকালই পাবেন। রিয়াল মাদ্রিদ সবসময়ই তার ঘর হয়ে থাকবে।
আলোনসোর বিদায়ের পর নতুন প্রধান কোচ হিসেবে আলভারো আরবেলোয়ার নাম ঘোষণা করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। এর আগে রিয়ালের একাডেমিতে কোচিং করাচ্ছিলেন সাবেক এই ডিফেন্ডার। ৪২ বছর বয়সি এই কোচ স্পেনের ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাব ক্যারিয়ারে ২০০৪-০৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে খেলেন আরবেলোয়া। মাঝে ২০০৭-০৮ মৌসুমে লিভারপুল ঘুরে ফের ২০০৯ সালে রিয়ালে যোগ দেন। মাদ্রিদের ক্লাবটিতে ছিলেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। রিয়ালের হয়ে খেলেছেন ওই সময়ে ১৫৩ ম্যাচ। ম্যানেজার হিসেবে ২০২০ সালে রিয়াল মাদ্রিদের ইয়ুথ টিমের দায়িত্ব নেন আরবেলোয়া।
এল ক্লাসিকোর হতাশা কাটিয়ে আগামী বুধবার কোপা দেল রেতে আলবাচেতের বিপক্ষে মাঠে নামবে রিয়াল মাদ্রিদ।