
আতলেতিকো মাদ্রিদ ও আর্সেনালের দুঃখ অতি সরলরেখায় বহমান—কখনোই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেনি ফুটবল বিশ্বের জায়ান্ট এই দুই ক্লাব। শিরোপার মঞ্চে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়েছে বরংবার। তবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা দল দুটির সামনে সুযোগ নিজেদের আরেকবার প্রমাণের। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের শুরুটা হতে যাচ্ছে আজ রাতেই।
চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের ফার্স্ট লেগে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আতলেতিকো মাদ্রিদ ও আর্সেনাল। মেত্রোপলিতানোতে বাংলাদেশ সময় রাত একটায় শুরু হবে এই মহারণ। ম্যাচ পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে আতলেতিকো কোচ দিয়েগো সিমিওনে কন্ঠে ঝরেছে আত্মবিশ্বাস। ইতিহাস বদলে দেওয়ার শপথ এই আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ডের। প্রায় একই কথা শোনা গেছে মিকেল আরতেতার প্রেসমিটেও।
আরও পড়ুন
| আতলেতিকো ম্যাচ ‘সিরিয়াসলি’ নিচ্ছেন আরতেতা |
|
ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় এ নিয়ে চতুর্থবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্সেনাল ও আতলেতিকো। গত অক্টোবরে লিগ পর্বের ম্যাচে আর্সেনালের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল সিমিওনের শিষ্যরা। আজকের ম্যাচে সেই হারের প্রতিশোধ নিয়ে বুদাপেস্টের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নামবে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
টানা হারের বৃত্ত ভেঙে গত শনিবার নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় তাদের প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে ফিরিয়ে এনেছে এবং একটি ঐতিহাসিক ‘ডাবল’ (লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ) জয়ের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। অন্যদিকে, আতলেতিকো মাদ্রিদের পূর্ণ মনোযোগ এখন চ্যাম্পিয়নস লিগে। সিমেওনে অন্য সবকিছুর চেয়ে এই শিরোপাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ফার্স্ট লেগ যেহেতু লস কলচনেরোসদের ডেরা খ্যাত মেত্রোপলিতানোতে। যেখান থেকে শত্রুপক্ষ খুব কমই জয় নিয়ে ফিরতে পেরেছে। হাতের তালুর মতো চিরচেনা সবুজ গালিচায় দুইবার মুখোমুখি হয়ে একবারও জয় বাগাতে পারেনি আর্সেনাল। প্রথম দেখাতে হারতে হয়েছিল গানারদের। তবে দ্বিতীয়টিতে পয়েন্ট ভাগাভাগিতে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের। দেখার বিষয় আর্সেনাল সেখানকার উত্তপ্ত পরিবেশ কীভাবে সামলায়, সেটিই জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি হতে পারে। কারণ, ফিরতি ম্যাচ যে তাদেরই আঙিনায়।
ঘরের মাঠে খেলা হলেও ইনজুরি নিয়ে কিছুটা চিন্তাগ্রস্ত আতলেতিকো। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে চোট পাওয়ায় পাবলো বারিওস এবং আদেমোলা লুকম্যানকে নিয়ে সংশয় তীব্র। আতলেতিকো ক্লাবের বিপক্ষে লা লিগার জয়ে বারিওস উরুর চোট পান। আর রিয়াল সোসিয়েদাদের কাছে কোপা দেল রে ফাইনাল হারের সময় চোট পাওয়ায় লুকম্যান সপ্তাহান্তের ম্যাচে খেলতেই পারেননি। তবে লুকম্যানের ফেরার সম্ভাবনা বেশি দেখা যাচ্ছে। যা সিমেওনের আক্রমণভাগকে শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে ডেভিড হাঙ্কো সম্ভবত মাঠের বাইরেই থাকছেন। এই অনুপস্থিতিগুলো আতলেতিকোর আক্রমণাত্মক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন
| ৫-৪ গোলের থ্রিলার একদমই উপভোগ করেননি কোম্পানি |
|
আর্সেনালের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। নিউক্যাসলের বিপক্ষে ম্যাচে এবারিচি এজে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে কয়েকগুণ। কাই হাভার্টজকেও আগে তুলে নেওয়া হয়েছিল সে ম্যাচে। স্বস্তির খবর বুকায়ো সাকা ইনজুরি কাটিয়ে ফিরেছেন। যদিও গত ম্যাচে তিনি বদলি হিসেবে নেমেছিলেন।
রিককার্ডো ক্যালাফিওরি ফেরার অপেক্ষায় আছেন এবং এই ম্যাচে তাকে দেখা যেতে পারে। তবে জুরিয়েন টিম্বার কুঁচকির ইনজুরির কারণে এখনো মাঠের বাইরে। মিকেল মেরিনো তার স্ট্রেস ফ্র্যাকচার থেকে সেরে ওঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা হচ্ছে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই তিনি ফিরতে পারবেন।
শত সমস্যার মাঝেও সম্ভবনা দেখছেন আরতেতা। ম্যাচ পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন ইতিহাস এবার বদলাবেই। স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘আমরা ঠিক এই জায়গাটিতেই থাকতে চেয়েছিলাম। গত নয় মাস কঠোর পরিশ্রম, আবেগ আর মানসম্মত পারফরম্যান্স দিয়ে আমরা এই সুযোগ অর্জন করেছি। এখন সময় নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার এবং বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার যে আমরা এই ট্রফিটা কতটা জিততে চাই। সুযোগ আমাদের সামনে, আমাদের এখন ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’
আর্সেনাল প্রতিপক্ষ হিসেবে যে দুর্দান্ত, সে কথা ম্যাচের আগে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সিমিওনে। তবে তিনি জানিয়েছেন, এমন লড়াইয়ের মুখোমুখি তারা আগেও হয়েছেন। তাই চাপমুক্ত থেকে খেলে যেতে চান। সিমিওনে বলেন, ‘চাপের কথা বলতে গেলে, আমি কোনো চাপ অনুভব করছি না। শিরোপার এত কাছে পৌঁছানোটা বরং রোমাঞ্চকর। এর আগে আমরা কখনো এটি জিততে পারিনি’
আতলেতিকো ও আর্সেনাল ম্যাচটি খুব সহজেই গোলবন্যায় ভেসে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। উভয় দলই সুসংগঠিত এবং সুশৃঙ্খল। আর্সেনাল কি পারবে আতলেতিকোর বৈরী পরিবেশ সামলাতে? মেত্রোপলিতানোর দর্শকদের গর্জন নকআউট পর্বের ম্যাচে প্রায়ই বড় প্রভাব ফেলে। সে দেয়াল বেদ করেই তবে, ইতিহাসের পথে এগোতে হবে আর্সেনালকে।
No posts available.
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২১ এম

ফিফা বিশ্বকাপের দামামা বাজতে থাকলেও চূড়ান্ত দল ঘোষণা নিয়ে বাড়তি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে জার্মানি। বুন্দেসলিগার শেষ দিনের খেলা এবং চোট আক্রান্ত খেলোয়াড়দের ফিটনেস প্রমাণের সুযোগ দিতে দল ঘোষণার তারিখ ৯ দিন পিছিয়ে দিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
মঙ্গলবার জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিত করেছে, ১২ মে এর পরিবর্তে এখন ২১ মে ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করা হবে। একই সাথে খেলোয়াড়দের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার সময়ও দুই দিন পিছিয়ে ২৭ মে করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
| ৫-৪ গোলের থ্রিলার একদমই উপভোগ করেননি কোম্পানি |
|
আগামী ১৬ মে বুন্দেসলিগার শেষ রাউন্ড। এরপর ২৩ মে বায়ার্ন মিউনিখ ও স্টুটগার্টের মধ্যে জার্মান কাপের ফাইনাল। জাতীয় দলের বড় একটি অংশ এই দুই ক্লাবের হওয়ায় খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দিতে চান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান। বায়ার্ন যদি ৩০ মে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পৌঁছায়, তবে সেই খেলোয়াড়রা আরও পরে জাতীয় দলে যোগ দেবেন।
দলে থাকা একাধিক ফুটবলারের চোট নিয়ে চিন্তিত নাগেলসম্যান। টুর্নামেন্ট থেকে গত মাসে ছিটকে গেছেন বায়ার্ন মিউনিখের ফরোয়ার্ড সার্জ নাবরি। তাঁর সতীর্থ লেনার্ট কার্ল বর্তমানে ফিট হয়ে দলে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই চালাচ্ছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে ৩১ মে ফিনল্যান্ড ও ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে জার্মানি। ১৪ জুন বিশ্বকাপের মূলপর্বের প্রথম ম্যাচে জার্মানির প্রতিপক্ষ নবাগত কুরাসাও। 'ই' গ্রুপে ডাই ম্যানশ্যাফটদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর।

আর্সেনালকে ইদানীং খুব একটা স্বস্তিতে দেখা যাচ্ছে না। গত শনিবার নিউক্যাসলের বিপক্ষে ১-০ গোলের কষ্টসাধ্য জয়টি ছিল তাদের গত সাত ম্যাচের মধ্যে মাত্র দ্বিতীয় জয়। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের (ফার্স্ট লেগ) আগে সেসব ভুলে যেতে চান মিকেল আরতেতা। আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে প্রাক-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে এই স্প্যানিশ কোচ জানিয়েছেন, গানাররা প্রস্তুত নিজেদের প্রমানের জন্য।
আরতেতা বলেন, ‘আমরা ঠিক এই জায়গাটিতেই থাকতে চেয়েছিলাম। গত নয় মাস কঠোর পরিশ্রম, আবেগ আর মানসম্মত পারফরম্যান্স দিয়ে আমরা এই সুযোগ অর্জন করেছি। এখন সময় নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার এবং বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার যে আমরা এই ট্রফিটা কতটা জিততে চাই। সুযোগ আমাদের সামনে, আমাদের এখন ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’
আরও পড়ুন
| ‘ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ’, বায়ার্নকে হারিয়ে উচ্ছ্বসিত এনরিকে |
|
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির সাথে শিরোপার লড়াই আর ২২ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর চাপ আর্সেনালের এই মৌসুমকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তবে ইউরোপের মঞ্চে তাদের সামনে আরও বড় অর্জনের সুযোগ। আর্সেনাল তাদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের খুব কাছে দাঁড়িয়ে। এর আগে তারা কখনোই এই টুর্নামেন্ট জেতেনি।
আরতেতা বলেন, ‘বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছি না আমি। কারণ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন এই ক্লাবটি টানা সাত বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে দূরে ছিল। তাই এই অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যা অর্জন করেছি তা অসাধারণ। আমরা জানি কাজটা কতটা কঠিন। টানা দুই বছর সেমিফাইনালে ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা এক বিশাল সম্মানের বিষয়।’
ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় এ নিয়ে চতুর্থবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্সেনাল ও আতলেতিকো। গত অক্টোবরে লিগ পর্বের ম্যাচে আর্সেনালের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল দিয়েগো সিমিওনের শিষ্যরা। শত বন্ধুর পথ মাড়িয়ে হাঁটলেও অন্তত শেষের সুখ উপভোগের কারণ হতে পারে গানারদের।

চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে পার্ক দে প্রাঁসে যখন গোলের উৎসব চলছিল তখন গ্যালারিতে বসে থাকা একজনের জন্য বেশ যন্ত্রনার। তিনি ভিনসেন্ট কোম্পানি। ডাগআউটে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বায়ার্ন মিউনিখের এই কোচকে মঙ্গলবার রাতে গ্যালারির মিডিয়া বক্সে বসে হজম করতে হয়েছে ৫-৪ গোলের হার। ম্যাচ শেষে কোম্পানি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ডাগআউট থেকে দূরে থাকার এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে মোটেও ‘মজাদার’ ছিল না।
তিনটি হলুদ কার্ডের কারণে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ডাগআউটে দাঁড়াতে পারেননি কোম্পানি। কানের ইয়ারপিস লাগিয়ে সহকারী অ্যারন ড্যাঙ্কসকে নির্দেশনা দিলেও নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়েছে তাঁর। ম্যাচ শেষে প্রাইম ভিডিওকে কোম্পানি বলেন, ‘গ্যালারিতে বসে থাকা মোটেও আনন্দের কিছু নয়। আমার জীবনে এমনটা আর কখনো না ঘটলে আমি খুশি হব। ৮০ মিটার দূর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।‘
আরও পড়ুন
| ‘ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ’, বায়ার্নকে হারিয়ে উচ্ছ্বসিত এনরিকে |
|
পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে এই ম্যাচকে তাঁর কোচিং জীবনের সেরা ম্যাচ বলে মন্তব্য করেছেন। অতীতে এনরিকে কৌশলগত আলোচনার জন্য মাঝেমধ্যে স্বেচ্ছায় গ্যালারিতে বসতেন, কিন্তু কোম্পানি সেই ধারণার সাথে একমত নন। বেলজিয়ান এই কোচ বলেন, ‘আমি জানি না কেন তিনি এমনটা করেন। আমি নিজে কখনোই তা করব না।‘
ম্যাচের শুরুটা ভালো হওয়ায় গ্যালারিতে কোম্পানির মুখে হাসি দেখা গেলেও পিএসজি যখন ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, তখন বেশ বিবর্ণ দেখা যায় তাকে। তবে ৩ গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে তাঁর দল লড়াইয়ে ফিরে ৪-৫ ব্যবধান করেছে তাতে খেলোয়াড়দের মানসিকতার প্রশংসা করতে ভুল করেননি বেলজিয়ান এই কোচ।
নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে কোম্পানি আগামী বুধবার দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে পুনরায় ডাগআউটে ফিরবেন। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের জয়ের চেয়েও আরও উত্তাল পরিবেশ তিনি মিউনিখে আশা করছেন। সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কোম্পানি বলেন, ‘মাদ্রিদ ম্যাচে যে উন্মাদনা ছিল, আমার তার চেয়েও বেশি কিছু চাই। মিউনিখে গ্যালারি যেন শান্ত না থাকে।‘
আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১ টায়।

বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ৯ গোলের অবিশ্বাস্য লড়াই শেষে পিএসজির কোচ লুইস এনরিকে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। রেকর্ড ৫-৪ ব্যবধানের জয়কে কোচিং ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ হিসেবে অভিহিত করেছেন স্প্যানিশ এই মাস্টারমাইন্ড।
বার্সেলোনার হয়ে লিওনেল মেসি-নেইমার জুনিয়র-লুইস সুয়ারেজদের নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বাদ পাওয়া এনরিকে মঙ্গলবার রাতের ম্যাচের তীব্রতায় অভিভূত। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনে এত তীব্র গতির ম্যাচ আর দেখিনি। আমি তো এক কিলোমিটারও দৌড়াইনি, তবুও আমি ভীষণ পরিশ্রান্ত। জানি না খেলোয়াড়দের মনের অবস্থা এখন কী!’
আরও পড়ুন
| গ্রিজম্যানের রাজকীয় বিদায়ের লক্ষ্যেই লড়বে আতলেতিকো |
|
৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও ৪ গোল হজম করা নিয়ে সাধারণত কোচরা চিন্তিত থাকেন, কিন্তু এনরিকে সেসব নিয়ে ভাবছেন না। তিনি বলেন, ‘আজকে দলের কোনো খুঁত বা ভুল ধরার সময় নয়। আজ কেবল সবাইকে অভিনন্দন জানানোর দিন। আমরা যেমন জেতার দাবিদার ছিলাম, তেমনি ড্র করা কিংবা হারার সম্ভাবনাও ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, এটিই আমার দেখা সেরা ম্যাচ।‘
আগামী সপ্তাহে ফিরতি লেগে বায়ার্নের মাঠে খেলতে হবে পিএসজিকে। প্রথম লেগ শেষে এগিয়ে থাকলেও কাজটা যে সহজ হবে না তা বেশ ভালো করেই জানেন এনরিকে। তাইতো ম্যাচ শেষে ছক কষা শুরু করে দিয়েছেন অভিজ্ঞ এই কোচ ‘স্টাফদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আমাদের জেতার জন্য কয়টি গোল করতে হবে বলে মনে করো?' তারা বলেছে, 'ন্যূনতম তিনটি।' বায়ার্ন মিউনিখ তাদের নিজেদের মাঠে আরও বেশি শক্তিশালী, তবে আমরা একই মানসিকতা নিয়ে খেলার চেষ্টা করব।‘
মঙ্গলবার রাতের এই ৫-৪ গোলের জয় চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছে। ফিরতি লেগেও যে রোমাঞ্চ ছড়াবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এক গোলের ব্যবধান নিয়ে এগিয়ে থাকা প্যারিসিয়ানদের চোখ এখন সেই ম্যাচ জিতে টানা দ্বিতীয় বারের মতো ইউরোপ সেরার ট্রফি উচিয়ে ধরার আরও কাছে যাওয়া।

পার্ক দে প্রাঁসে গোল উৎসব হবে সেটা সহজ অনুমেয় ছিল। পরিসংখ্যান বলছিল, চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের ফার্স্ট লেগের আগে মৌসুমে পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখ ৩৮টি করে গোল প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়েছে। এবার তারা একে অন্যের বিপক্ষে গোল করেছে ৯টি। যার পাঁচটি পিএসজির, চারটি বায়ার্নের।
প্যারিসে গোল উৎসবের রাতে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্নের বিপক্ষে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে ফিরতি লেগের জন্য প্রস্তুতিটা ভালোভাবেই সারল লুইস এনরিকের দল। তাছাড়া টানা পাঁচ ম্যাচ হারের পর বাভারিয়ানদের বিপক্ষে জয়ের দেখা পেল ফরাসি ক্লাবটি।
মঙ্গলবারের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে বিরতির আগেই ৫টা গোল হয়। যার দুটি গেল পিএসজির জালে, তিনটা হজম করল বাভারিয়ানরা। বিরতির পর তাই দুই পাশের জালে ঢুকল আরও দুটি করে গোল। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে গোলপ্রসবা সেমিফাইনালের রেকর্ড গড়া ম্যাচে পিএসজি জিতল ৫-৪ গোলে।
কিক অফ থেকে ম্যাচের দশম মিনিট পর্যন্ত অনেকটা নিষ্প্রভ ছিল ম্যাচ। এরপর আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচ। ১৬তম মিনিটে ডেভিসের দুর্দান্ত হেডে ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে বায়ার্ন মিউনিখ দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠে। ওলিসের বাড়ানো বলে লুইস দিয়াজ শট নিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক তখনই পাচোর চ্যালেঞ্জে তিনি পড়ে যান এবং রেফারির বাঁশি সঙ্গে সঙ্গে।
সেখান থেকে পেনাল্টি আদায় করেন হ্যারি কেইন। প্রথমে দৌড়ে এসে কিছু থামেন ইংলিশ স্ট্রাইকার। এরপর তার ডান পায়ের নিচু শট কাঁপান জাল। কিছু করার উপায়ও ছিল না সাফনভের।
চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে কেইন তার ৫৪ নম্বর গোলটি পূর্ণ করেন দলকে লিড এনে দেওয়ার সময়। লিগে বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড় হিসেবে টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচে গোল করার রেকর্ডে এখন তিনি রবার্ট লেভানডভস্কির কাতারে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে লেভানডভস্কি টানা ৫ ম্যাচে গোল করেছিলেন। আজ কেইনও সেই মাইলফলক ছুঁলেন। একইসঙ্গে লিগের নকআউট পর্বে নিজের খেলা শেষ ৫টি ম্যাচেই গোল করার কৃতিত্ব দেখালেন কেইন।
ঠিক এক মিনিট পরই বড় ঝুঁকি এড়ান সাফনভ। কেইনের ক্রস কাজে লাগিয়ে বক্সে থাকা মাইকেল ওলিসে গোলবারে শট নেন। কিন্তু রাশিয়ান গোলকিপার তার সেই শট রুখে দেন।
২২তম মিনেট উসমান দেম্বেলে যে সহজ সুযোগ মিস করলেন, এর জন্য বহুদিন তাকে হতাশায় পুড়তেও হতে পারে। ওয়ান এন্ড ওয়ান পজিশনে কেবল তিনি পান বায়ার্ন গোলকিপার ম্যানুয়েল নয়্যারকে। অথচ বারের বাইর দিয়ে শট নিয়ে নেন ফরাসি ফরোয়ার্ড।
সমতায় ফিরতি বেশি সময় নেননি খিচা কাভারাস্কাইয়া। বাঁ-পাশ থেকে একাই আক্রমণে ওঠেন জর্জিয়ান উইঙ্গার। ড্রিবলিং করে ডুকে পড়েন ডি বক্সে। এরপর স্তানিসিচকে বডি ডসে ঘায়েল করে বাঁকানো শটে কাঁপান জাল।
নিজেদের মাঠে ৩২তম মিনিটে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ফরাসি জায়ান্টরা। বাঁ-পাশের কর্নার থেকে দেম্বেলের হাওয়ায় ভাসানো শট দারুণ টাইমিংয়ে লাফিয়ে উঠে বলের দিশা বদলে দেন জোয়াও নেভেস। যা সরাসরি জালে আশ্রয় নেয়। লিগে এটি তাঁর দ্বিতীয় গোল।
পিএসজিকে বেশিক্ষণ লিড ধরে রাখতে দিল না বাভারিয়ানরা। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে স্কোরলাইন ২-২ করে ম্যাচে ফিরে অতিথিরা। আলেকজান্ডার পাভলোভিচের ছোট পাস থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের প্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে যান মাইকেল ওলিসে। এরপর চমৎকার এক বাঁকানো শটে বল জালে পাঠিয়ে সাফোনভকে হতাশ করেন তিনি। বায়ার্নের দারুণ এক আক্রমণে ম্যাচে ফিরে সমতা।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে সময়ের দেম্বেলের কর্নার থেকে নেওয়া লো-ক্রস ব্লক করতে যান আলফোনসো ডেভিস। কিন্তু বলটি তার হাতে লাগে। এরপর পেনাল্টির জোরালো আবেদন করে পিএসজি। মুহূর্তে ভিএআরের সাহায্য নেন রেফারি। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের পক্ষে যায় সিদ্ধান্ত। সেখান থেকে গোল আদায় করেন দেম্বেলে। সবমিলিয়ে ৩-২ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় পিএসজি। মাঝমাঠ থেকে ভিতিনিয়ার বাড়ানো লম্বা পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠেন আশরাফ হাকিমি। বক্সে তার পাঠানো বিপজ্জনক নিচু ক্রসটি উসমান দেম্বেলে বুদ্ধিদীপ্তভাবে ছেড়ে দিলে বল পান খিচা কাভারাস্কাইয়া। কোনো ভুল না করে জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি পূর্ণ করেন এই জর্জিয়ান ফরোয়ার্ড।
পরের মিনিটে ব্যবধান ৫-২ করে ফেলে লুইস এনরিকের শিষ্যরা। বাঁ প্রান্ত থেকে দুয়ের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন উসমান ডেম্বেলে। উপামেকানোর পায়ের ফাঁক দিয়ে নেওয়া তার নিখুঁত নিচু শটটি বাম দিকের পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। বায়ার্নের কিংবদন্তি গোলরক্ষক নয়্যার কেবল চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। পিএসজির গোল উৎসব এখন পূর্ণতা পেল।
৬৪তম মিনিটে সেটপিস থেকে ব্যবধান কমাতে সাহায্যে করেন উপকোমানো। জশুয়া কিমিখের বুলেট গতির শট কেবল মাথা ছুঁইয়ে লক্ষ্যবেদ করেন ফরাসি সেন্টারব্যাক। পরের মিনিটে আরও একটি গোল করেন লুইস দিয়াজ। নিজেদের অর্ধ থেকে কেইনের লং রেঞ্জের শট নিয়ন্ত্রনে নিয়ে বক্সে ডুকে পড়েন কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড। পরবর্তীতে ডান পায়ের কৌশলী শটে আদায় করেন গোল। সে সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগের টানা চার ম্যাচে জালের দেখা পেয়ে পেলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫-৪ শেষ হয় ম্যাচ।
ফার্স্ট রেগে পিএসজি এগিয়ে থাকলেও অতিথি বায়ার্ন মাঠের দখলে এগিয়ে ছিঝল। প্রায় ৫৭ শতাংশ বল তাদের দখলে ছিল। ১২টি শট নিয়ে ৫টি লক্ষ্যে রাখে স্বাগতিকরা। ১০টি শট নিয়ে ৮টি লক্ষ্যে রাখে বায়ার্ন।