
কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির আগমন ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চরম অব্যবস্থাপনার ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি মেসি ও তার ভক্ত-সমর্থকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে মমতা লেখেন, “সল্টলেক স্টেডিয়ামে যে অব্যবস্থাপনা হয়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিস্মিত।”
“হাজার হাজার ক্রীড়াপ্রেমী ও সমর্থকের সঙ্গে আমিও আজ স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিলাম, তাদের প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসির এক ঝলক দেখার জন্য। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য আমি লিওনেল মেসি-সহ সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমী ও তাঁর ভক্তদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।”
ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আশিম কুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন মমতা।
‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৫’-র অংশ হিসেবে ভারতে তিনদিনের জন্য এসেছেন মেসি। আজ ট্যুরের প্রথম দিনে সল্টলেক স্টেডিয়ামে যান আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি। তবে অতিরিক্ত ভিড়, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়।
এক পর্যায়ে গ্যালারি থেকে বোতল ও চেয়ার ছোড়া শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে নির্ধারিত ল্যাপ অব অনার সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন মেসি।
অনেক দর্শক ব্যানার ও আসন ভাঙচুর করেন। আবার অনেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে দুয়ো দেন। পুরো ঘটনাটি ঘিরে নিরাপত্তা ও আয়োজনের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা। এক মেসি-ভক্ত বলেন, ‘মেসির চারপাশে শুধু নেতা আর অভিনেতারাই ছিল। তাহলে আমাদের কেন ডাকা হলো? আমরা ১২ হাজার টাকার টিকিট কেটেছি, অথচ তার মুখটাই দেখতে পারিনি।’
কলকাতার পর হায়দরাবাদ, মুম্বাই ও নয়াদিল্লির একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে মেসির।
No posts available.
৯ মার্চ ২০২৬, ৭:৩৯ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আর্জেন্টিনা ও স্পেন-এর মধ্যকার ফিনালিসিমা ম্যাচটি। তবে মহাদেশীয় দুই চ্যাম্পিয়নের লড়াই ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যেই মিলল সুখবর।
আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আবারও ফিনালিসিমার আয়োজক দেশ কাতারের মাঠে ফিরছে ফুটবল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পথে এটিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ মার্চ দোহায় ফিনালিসিমা আয়োজনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
কাতারের ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলো এই সপ্তাহেই আবার শুরু হতে যাচ্ছে। এরমধ্যে আছে কাতার স্টার্স লিগ। ইতোমধ্যে বৃহস্পতিবারের জন্য তিনটি ম্যাচের সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। শনিবার থেকে ক্লাবগুলো আবার অনুশীলন শুরু করেছে, যদিও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে দলগুলো বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, এরপরও জাতীয় প্রতিযোগিতা পুনরায় শুরু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাতারের ক্লাবগুলোকে আবার অনুশীলন কেন্দ্র ও স্টেডিয়ামে ফিরতে অনুমতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, তবে কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে। খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা বাড়তি নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলছেন এবং আয়োজকরা পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
ফিনালিসিমার আয়োজক শহর এখনও চূড়ান্ত নয়
এখন পর্যন্ত ফিনালিসিমার আয়োজক শহর হিসেবে কাতারের দোহাকেই ধরা হচ্ছে। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের মহারণ নিয়ে সমর্থকদের আবেগ উত্তেজনা এখনো প্রবল। গত কয়েক দিনে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে কয়েকটি স্টেডিয়ামের নাম আলোচনায় এলেও, কনমেবল ও ইউয়েফা দ্রুতই সেই জল্পনা থামিয়ে দেয়। যৌথ এক বিবৃতিতে দুই সংস্থা জানায়, ভেন্যু নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এ সপ্তাহের শেষের দিকে নেওয়া হবে।
দুই মহাদেশের ফুটবল নিয়ন্তক সংস্থার বিলম্বকে অনেকেই সময় নেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন, যাতে কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা সিদ্ধান্তকে জটিল করছে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে কাতার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। অঞ্চলে ইরানের সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও দুই দিন আগে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা করা হবে না—তবু পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কিছু ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। আকাশসীমায় আরোপ করা বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে, আর ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতা ফের শুরু হওয়াও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বড় ক্রীড়া আয়োজনের জন্য পরিবেশ ধীরে ধীরে অনুকূল হতে পারে।
এই ধারা বজায় থাকলে, আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাতারই ফিনালিসিমা আয়োজন করতে পারে। পাশাপাশি কাতার ফুটবল ফেস্টিভাল–এর অংশ হিসেবে নির্ধারিত আরও পাঁচটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কদিন পর পরই অদ্ভুত আর আপত্তিকর ঘটনা ঘটিয়ে আলোচনায় আসবেন হোসে মরিনিয়ো, এটাই যেন নিয়ম। কোচিং ক্যারিয়ারে হরেদরে বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেওয়া অভিজ্ঞ এই কোচ এবার পর্তুগালের শীর্ষ লিগে পোর্তোর বিপক্ষে ম্যাচে দেখলেন লাল কার্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বহিষ্কার হওয়ার ঘটনার রেশ না কাটতেই আবার লাল কার্ড দেখতে হলো তাকে।
পোর্তোর বিপক্ষে গতকাল ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচের শেষদিকে ঘটে আপত্তিকর ঘটনা। যোগ করা সময়ের একটি ঘটনায় বেনফিকার ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডিকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। সেটাই যেন ক্ষুব্ধ করে তোলে মরিনিয়োকে। পরে লকার রুমে যাওয়ার সময় প্রতিপক্ষ দলের স্টাফদের উদ্দেশ করে আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করায় তাকেও লাল কার্ড দেখান রেফারি।
অবশ্য ম্যাচের পর লাল কার্ড দেখার অন্য কারণ শোনা গেল মরিনিয়োর মুখে। পোর্তোর সাবেক এই কোচ বলেন, ‘রেফারি আমাকে বলেছেন যে, পোর্তো বেঞ্চের দিকে একটি বল ছুঁড়ে মারায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু এটা পুরোপুরি মিথ্যা।অনেক সময়ই, যখন আমরা গোল করি, আমি স্ট্যান্ডে বল কিক মারি কোনো এক ভাগ্যবানকে (দর্শককে) সুযোগ দিতে। আমি জানি, টেকনিক্যালি আমি খুব ভালো নই, কিন্তু শটটা গ্যালারির দিকে ছিল। আমাকে অন্যায্যভাবে লাল কার্ড দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ অফিসিয়াল গোটা ম্যাচ জুড়েই খুব খারাপভাবে দায়িত্ব সামলেছে।’
৬৩ বছর বয়সী মরিনিয়োর অভিযোগ পোর্তোর কোচ তাকে নাকি পঞ্চাশবার ‘বিশ্বাসঘাতক বলে গালি দেন, ‘তিনি আমাকে পঞ্চাশবার বিশ্বাসঘাতক বলেছেন। আমি জানতে চাই, বিশ্বাসঘাতক কী হওয়ার জন্য? আমি পোর্তোতে গিয়েছিলাম, আমার প্রাণ উৎসর্গ করেছি। এরপর চেলসি, ইন্টার, রিয়াল মাদ্রিদ—সারা বিশ্বের ক্লাবে কাজ করেছি, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা দিয়েছি। এটাকেই আমি পেশাদারিত্ব বলি।’
মরিনিয়ো আরও যোগ করেন, ‘আমি এটা পছন্দ করি না। ভক্তদের গালি আলাদা, সেটা ফুটবল। কিন্তু একজন পেশাদারের কাছ থেকে? তিনি ও একজন পেশাদার, বিভিন্ন জার্সি পরেছেন, আমি বুঝতে পারছি না। বিশ্বাসঘাতক কেন? সব কিছু দেওয়ার জন্য বেনফিকাকে?’
কোচিং ক্যারিয়ারে এই পোর্তোর হয়েই দারুণ সাফল্য পেয়েছিলেন মরিনিয়ো। তাঁর অধীনে পর্তুগিজ ক্লাবটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে। ২০০১ সালে ক্লাবটিতে যোগ দিয়ে আড়াই বছর ডাগ-আউটে ছিলেন তিনি।
২০০০ সালে বেনফিকাকে প্রথম দফায় কোচিং করানোর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফেনেরবাচে থেকে দ্বিতীয় দফায় বেনফিকায় যোগ দেন মরিনিয়ো। এই মৌসুমে লিগ জয়ের দৌড়ে মরিনিয়োর বেনফিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দী পোর্তো ও স্পোর্টিং সিপি। পোর্তোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর ২৫ ম্যাচে ৫৯ নম্বর নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের তিন নম্বরে আছে বেনফিকা। সমান ম্যাচে ৬৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে পোর্তো। দুই নম্বরে থাকা স্পোর্টিংয়ের পয়েন্ট ৬২।

এএফসি উইমেন’স এশিয়ান কাপে তিন খেলায় শতভাগ পরাজয়ে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে চীনের কাছে ২-০, পরের ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫-০ এবং শেষ খেলায় আজ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৪-০ গোলে হেরেছে পিটার বাটলারের দল। প্রথমবারের মতো এশিয়ান মঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানতে পারল লাল সবুজের মেয়েরা। তবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স এবং নিবেদনে অসন্তুষ্ট নন বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার। সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতির কথা বলেছেন বাংলাদেশের ব্রিটিশ কোচ।
প্রথমবার এশিয়ান কাপে খেলার পর স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে পরের এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার জন্য কোচের পরিকল্পনা কি। এমন প্রশ্নের উত্তরে বাটলার বলেন,
‘আমি এখানে থাকছি না। আমি আগামী সপ্তাহে ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছি এবং সেখানে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব। আমি কী করতে চাই, সেটা অনেকদিন ধরেই আমার মাথায় ঘুরছে।’
‘সবার আগে আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে। ভিডিও সরঞ্জামাদী এবং ক্যামেরা দিয়ে শুরু করতে হবে। পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। আপনি যদি বড় দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে চান, তবে বুঝতে হবে যে সাফ লেভেলের চেয়ে এই লেভেলটা অনেক উঁচুতে। সাফে আপনি আসলে সেভাবে পরীক্ষিত হন না।’ বলেন বাটলার।
পরিকল্পনার কথা বলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন বলেও জানান বাংলাদেশ কোচ। তাঁর অধিনে সবশেষ ২০২৪ সালের সাফে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। এরপর গত জুন-জুলাইয়ে মিয়ানমারে হওয়া এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে কোয়ালিফাই করেন রুপনা, ঋতুপর্ণা, মনিকা চাকমারা। বয়সভিত্তিক সাফেও আছে তাঁর শিরোপা।
বাটলারের সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) চুক্তি ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখনই তাই কোচের থাকা, না থাকা নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। তবে আজ সংবাদ সম্মেলনে তাঁর নিজের বলা ‘আমি এখানে থাকছি না’ থেকেই সন্দেহের উদ্রেক। এ নিয়ে আবার জানতে চাইলে কোচ বলেন, ‘আমি ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব, আমার কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বের হব এবং এরপর আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবব। কারণ যেভাবে প্রত্যাশা ছিল, সেভাবে সাহায্য বা সাপোর্ট না পেলে আমি দায়িত্ব চালিয়ে নিতে পারছি না।’
পরিকল্পনার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে বাটলার বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। আমাদের পরিকল্পনায় অনেক ঘাটতি আছে।’ তারপরও এই টুর্নামেন্ট থেকে ইতিবাচক অনেক কিছু পেয়েছেন বলে জানান তিনি, ‘অনেক কিছু শেখার আছে। আপনি যদি মন খোলা রাখেন, তবে অনেক কিছুই শিখতে পারবেন। আমি ইংলিশ ফুটবলের প্রতিটি স্তরে কাজ করেছি, তাই আমি বাস্তববাদী। আমি রূপকথার জগতে বাস করি না।’

যুদ্ধের ঢামাঢোলে উত্তপ্ত দেশ। রাজনৈতিক বৈরতা আর বাতাসে বারুদের গন্ধ। তেহরানের আকাশে শঙ্খচিল উড়াউড়ির বদলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের চোখ রাঙানি। প্রাণনাশি ক্ষেপণাস্ত্র মাড়িয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল। শত শত বসতভিটা বোমার আঘাতে ভাগাড়ে প্রাণহীন।
১৩শ মাইল দূর থেকে এসব কেবলই যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাহরা গনবারিদের জন্য। এএফসি উইমেন’স এশিয়ান কাপ অংশ নিতে জাহরার নেতৃত্বে ইরান নারী ফুটবল দল যখন পা রাখে অস্ট্রেলিয়া, তখন তেহরানে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অসংখ্য নেতা নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায়। সেসবের মাঝেই খেলা চালিয়ে গেছেন ইরানের মেয়েরা।
যেখানে দুঃখ আর বুকের পাঁজর চাপা কষ্ট, সেখানে খেলা চালিয়ে যাওয়াটাও দুর্ভেদ্য। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের তিনটিতেই হেরেছে ইরানের মেয়ে। সবশেষ ফিলিপাইনের বিপক্ষে ২-০ গোলের ব্যর্থতায় বিদায়ঘণ্টা বাজে। এশিয়াসেরা মঞ্চে দ্বিতীয়বার অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি তারা।
তিনে-শূন্য হারের পরও হৃদয় জয় করেছে দিদাররা। তাদের দৃঢ়তা এবং দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার আত্মবিশ্বাস অনেকের কাছে প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ম্যাচের আগে সামরিক স্যালুট বা দেশের জন্য লড়াই করা দিদাররা এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায়।
যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় ইরান নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে ইরানের প্রতিটি স্থানে হুমকি বিদ্যমান—হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ বা আবাসিক এলাকা—কেউই নিরাপদ নয়। সেই কারণে রবিবার গোল্ড কোস্ট স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার পর ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফা এবং অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ইরানের ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
রবিবার ফিলিপাইনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম থেকে দলের বাস বের হওয়ার সময় শত শত সমর্থক বাসটিকে ঘিরে ধরে। তারা ‘আমাদের মেয়েদের বাঁচান’ স্লোগান তুলে।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ইরান নারী দলের জাতীয় সংগীত না গাওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দ্বিগুণ হয়। এই ঘটনায় সমালোচনা শুরু হয় এবং এক সমালোচক এটিকে “যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতকতা” বলে আখ্যা দেন, কঠোর শাস্তির দাবি তোলেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ও মানবাধিকার কর্মী ক্রেইগ ফোস্টার বলেন,
“তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সবারই যুক্তিসংগত ও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।” তিনি বিবিসিকে বলেন, “যখন কোনো দল ফিফা নিয়ন্ত্রিত টুর্নামেন্টে অংশ নেয়—হোক সেটা এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন বা অন্য কোনো কনফেডারেশন—তখন তাদের নিরাপদ থাকার অধিকার থাকতে হবে এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রকাশের সুযোগও থাকতে হবে।”
দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং শেষ ম্যাচে ফিলিপাইনের বিপক্ষে ইরানের খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীত গেয়ে সালাম দিয়েছে। সমালোচকেরা মনে করছেন, দেশের কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে তারা জাতীয় সংগীত গাইতে বাধ্য হয়েছেন।
শেষ ম্যাচে উপস্থিত এক সমর্থক বলেন, “সত্যি বলতে আমরা এটা আশা করি না, কারণ আমরা জানি এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত।” রবিবার স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী ইরানি কমিউনিটির শত শত মানুষ উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় তারা শিস ও প্রতিবাদ করেছে।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে অনেক সমর্থক “লায়ন্স এন্ড সান” পতাকা উড়িয়ে দেন—যেটি ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় পতাকা ছিল। স্টেডিয়ামের বাইরে কেবল বর্তমান সরকারি পতাকা প্রদর্শনের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তারা গোপনে পতাকাগুলো ভেতরে নিয়ে আসে।
ম্যাচ দেখতে আসা আরেক সমর্থক বলেন,
“তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না, কারণ তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা এখানে এসেছি তাদের জানাতে যে আমরা পুরোপুরি তাদের পাশে আছি।”
খেলোয়াড়রা দেশে ফেরার পর কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন—এ নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাচ্ছে। সেই কারণে কেউ চাইলে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। তবে কোনো খেলোয়াড় সত্যিই তা চাইবেন কি না, কিংবা চাইলে তাদের পরিবারের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে—এটি এখনো স্পষ্ট নয়।
ক্রেইগ ফোস্টার বলেন, “দলের ম্যানেজমেন্ট তাদের হোটেলে প্রায় বন্দি রেখেছে। বাইরের কমিউনিটি, বন্ধু, পরিবার বা সহায়তা নেটওয়ার্ক—এমনকি আইনজীবীর সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “কারও উদ্বেগ থাকতে পারে, কারও নাও থাকতে পারে। তবে আমরা জানি তাদের অধিকাংশের পরিবার দেশে আছে, কারও কারও সন্তানও রয়েছে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ দিলেও অনেকেই সেটা নাও নিতে পারেন।”
ফিলিপাইন ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে দলের ম্যানেজার জাফারি বলেন, “আমরা দ্রুত দেশে ফিরে যেতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে আমার পরিবার ও দেশের মানুষের সঙ্গে থাকতে চাই।”
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং বলেন, “আমরা ইরানের নারী ও পুরুষের প্রতি, বিশেষ করে নারী ও কন্যাদের প্রতি সংহতি জানাই। এটি এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যা নিজের জনগণের ওপর কঠোর দমন চালিয়েছে।”
রবিবার রাতে স্টেডিয়াম থেকে দলটির বাস বের হওয়ার সময় সমর্থকদের হাতে ব্যানার দেখা যায়—যেখানে লেখা ছিল, “অস্ট্রেলিয়াতে নিরাপদে থাকো, পুলিশের সঙ্গে কথা বলো”।
বাসের ভেতরে বসে খেলোয়াড়রা বৃষ্টির মধ্যে বাইরে ঘটে যাওয়া দৃশ্য দেখছিলেন। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিল। কেউ এসব দেশে মৃদু হাসছিলেন ও হাত নাড়াচ্ছিলেন, আবার কেউ গম্ভীর মুখে ছিলেন। অন্তত একজনকে বাসের জানালার পর্দা টেনে দিতে দেখা গেছে।
শেষ পর্যন্ত বাসটি প্রধান সড়কে উঠে প্রায় ১৫ মিনিট দূরে দলীয় হোটেলের দিকে চলে যায়। এতে কয়েকজন সমর্থক কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সোমবার পাঁচতারকা রিসোর্টে কড়া নিরাপত্তা দেখা গেছে। হোটেলের সামনে ফেডারেল পুলিশ মোতায়েন ছিল। দলের কোনো খেলোয়াড়কে দেখা না গেলেও প্রতিনিধি দলের কয়েকজন সদস্য হোটেলের সাধারণ জায়গায় বসেছিলেন। তারা কখন হোটেল ছাড়বে—ইরানে ফিরবে নাকি অন্য কোনো দেশে যাবে—এখনো স্পষ্ট নয়।
অ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়ার শরণার্থী অধিকারকর্মী জাকি হাইদারি বলেন,
“এখানে অস্ট্রেলিয়া সরকারের উচিত নৈতিক নেতৃত্ব দেখানো। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সময়ে যখন আমরা নারীর স্বাধীনতা, সমতা ও নিপীড়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, তখন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ফুটবল মাঠ রূপ নিয়েছিল রীতিমতো রণক্ষেত্রে। ভয়াবহ সংঘর্ষ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় নিরাপত্তাকর্মী সামরিক পুলিশকেও। শেষ পর্যন্ত ভিডিও দেখে দুই দলের মোট ২৩ জন ফুটবলারকে দেখানো হয় লাল কার্ড।
নজীরবিহীন এমন ঘটনা দেখা গেল ব্রাজিলের ক্যাম্পেনাতো মিনেইরোর ফাইনালে। শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে ক্রইজেরো ও অ্যাটলেটিকো মিনেইরোর ম্যাচ শেষেই শুরু হয় উত্তেজনা। ক্রুজেইরো ১–০ ব্যবধানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মিনেইরোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের পর প্রথমবার মিনাস জেরাইস অঙ্গরাজ্যের শিরোপা জিতল দলটি।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভয়াবহ মারামারিতে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন অ্যাটলেটিকোর গোলরক্ষক এভার্সন লুজ বল ধরতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ক্রুজেইরোর মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং তার বুকের ওপর হাঁটু দিয়ে চাপ দেন।
এরপরই ক্রিস্টিয়ানের সতীর্থরা এগিয়ে এসে এভারসনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন এবং তাকে গোলপোস্টের দিকে ঠেলে দেন। মুহূর্তেই আরও খেলোয়াড় সেখানে জড়ো হলে বড় ধরনের হাতাহাতি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তাকর্মীরা দুই দলকে আলাদা করার চেষ্টা করেন।
ম্যাচ চলাকালে রেফারি ম্যাথুউস ডেলগাডো কানদানো কাউকে লাল কার্ড দেখাননি। তবে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম গ্লোবো জানিয়েছে, সংঘর্ষের কারণে মাঠে কার্ড দেখানো সম্ভব না হওয়ায় পরে ভিডিও দেখে ২৩ জনকে বহিষ্কার করা হয়।
ক্রুজেইরোর গোলদাতা কাইও জর্জেসহ ১২ জন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন। অন্যদিকে অ্যাটলেটিকোর ১১ জন খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হন, যাদের মধ্যে সাবেক অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ও নটিংহাম ফরেস্টের ডিফেন্ডার রেনান লোদি এবং হাল্কও আছেন।
বিরল এই ঘটনার পর হাল্ক বলেন,
‘এটা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা এমন নজির স্থাপন করতে পারি না, কারণ এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়ে। আমাদের নিজেদের ভাবমূর্তি এবং ক্লাবের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আছে।’