
সাঞ্জু স্যামসন, ইশান কিষান ও অভিষেক শর্মার তাণ্ডবে আড়াইশ ছাড়ানো পুঁজি পেল ভারত। এরপর যা একটু লড়াই করলেন টিম সেইফার্ট। তাকে থামিয়ে ম্যাচ আর জমতেই দিল না স্বাগতিকরা। নিউ জিল্যান্ডকে অল্পেই গুঁড়িয়ে আবারও চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারায় ভারত। আগে ব্যাট করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৫৫ রান করে ভারত। জবাবে ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায় কিউইরা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে পরপর দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল তারা। এছাড়াও ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা প্রথম দলও হয়ে গেল তারা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভারতের এটি তৃতীয় শিরোপা। এর আগে ২০০৭ সালে টুর্নামেন্টের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এই সংস্করণের বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ শিরোপার রেকর্ড। এর বাইরে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের আছে ২টি করে বিশ্বকাপ ট্রফি।
এ নিয়ে দুটি ফাইনালে হারল ভারত। এর আগে ২০২১ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিল তারা।
ইতিহাস গড়া শিরোপাটি রেকর্ড গড়েই জিতেছে ভারত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রানের হিসেবে এটি ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। চলতি বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্বে তারা নামিবিয়াকে হারিয়েছিল ৯৩ রানে।
বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরাজয় এটি। গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের কাছে তারা হেরেছিল ৮৪ রানে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের এটিই সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। আগের রেকর্ডও ছিল ভারতের। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৭৬ রান করেছিল তারা। সেদিন ৭ রানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা।
এ নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে সাতবার আড়াইশর বেশি রান করল ভারত। পাঁচবারের বেশি নেই আর কোনো দলের। এছাড়া এক টুর্নামেন্টে তিনবার আড়াইশ করা দ্বিতীয় দল ভারত। ২০২৪ সালের আইপিএলে তিনবার আড়াইশ করেছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ।
সাতবারের মধ্যে শুধু ২০২৬ সালেই চারবার আড়াইশর বেশি রান করেছে ভারত। যে কোনো দলের জন্য এক পঞ্জিকাবর্ষে এটিই সর্বোচ্চ।
শুধু সর্বোচ্চ দলীয় স্কোরই নয়, ফাইনাল ম্যাচে বিশ্ব রেকর্ডের ছড়াছড়ি করেছে ভারত। যার বড় কারিগর ওপরের সারির তিন ব্যাটার অভিষেক, স্যামসন ও ইশান।
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে প্রথম দুই ওভার রয়েসয়ে খেলেন অভিষেক ও স্যামসন। তৃতীয় ওভার থেকে শুরু হয় তাণ্ডব। তৃতীয় ও চতুর্থ ওভার মিলিয়ে তারা নেন ৩৯ রান। ৪ ওভারে পূর্ণ হয়ে যায় ভারতের পঞ্চাশ রান।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল বা ফাইনালে এর চেয়ে দ্রুত দলীয় পঞ্চাশের রেকর্ড নেই আর কোনো দলের।
পাওয়ার প্লের শেষ দুই ওভারেও থামাথামির কোনো নাম নেই। একই গতিতে এগিয়ে ওই দুই ওভার থেকে আরও ৪১ রান নেন দুই ওপেনার। পাওয়ার প্লেতে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৯২ রান করে ফেলে ভারত। বিশ্বকাপের পাওয়ার প্লেতে এটিই সর্বোচ্চ স্কোর।
আগের ম্যাচগুলোতে অফফর্মে থাকা অভিষেক এদিন মাত্র ১৮ বলে করেন ফিফটি। বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে এটিই দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। আগের রেকর্ড ছিল চলতি বিশ্বকাপেই ফিন অ্যালেন ও জ্যাকব বেথেলের (১৯ বলে)।
অষ্টম ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলে ৯৮ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন রাচিন রবীন্দ্র। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এটিই সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড। ২০০৯ সালে পাকিস্তানের দুই ওপেনার কামরান আকমল ও শাহজাইব হাসানের ৪৮ রান ছিল আগের সর্বোচ্চ।
শুরুতে তাণ্ডব চালিয়ে ৬ চারের সঙ্গে ৩ ছক্কা মেরে ২১ বলে ৫২ রান করেন অভিষেক।
এরপর তিন নম্বরে নেমে অভিষেকের দেখানো পথেই এগোতে থাকেন ইশান। আগের দুই ম্যাচে ফিফটি করা স্যামসন এদিনও পেয়ে যান পঞ্চাশের দেখা।
বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালে ফিফটি করা বিশ্বের মাত্র তৃতীয় ব্যাটার স্যামসন। আগের দুজন শহিদ আফ্রিদি (২০০৯) ও বিরাট কোহলি (২০১৪)।
বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ৭.২ ওভারেই ১০০ করে ফেলে ভারত। বিশ্বকাপের নক আউটে এটিই দ্রুততম দলীয় ১০০ রানের রেকর্ড। চলতি বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭.৫ ওভারে ১০০ রান করে রেকর্ডটি ছিল নিউ জিল্যান্ডের।
দুই ওপেনারের ঝড় থামতে না দিয়ে উল্টো আরও তাণ্ডব চালিয়ে ৩ চারের সঙ্গে ৪ ছক্কায় ২৩ বলে ফিফটি করে ফেলেন ইশান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলের প্রথম তিন ব্যাটার পেল ফিফটির স্বাদ।
স্যামসনের সঙ্গে ইশানের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ১৫ ওভারেই দুইশ করে ফেলে ভারত। মনে হচ্ছিল ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার করা ২৬০ রানের রেকর্ড হয়তো ভেঙে ফেলবে তারা। কিন্তু ১৬তম ওভারে স্যামসন, ইশান ও সূর্যকুমারকে আউট করে দেন জিমি নিশাম।
৫ চারের সঙ্গে ৮টি ছক্কা মেরে ৪৬ বলে ৮৯ রান করে আউট হন স্যামসন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে মাত্র ৫ ইনিংসে তার ছক্কা ২৪টি। এক বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড।
ইশানের ব্যাট থেকে আসে ৪টি করে চার-ছক্কায় ২৫ বলে ৫৪ রান। রানের খাতাই খুলতে পারেননি ভারত অধিনায়ক। নিশামের ওই ওভারের ধাক্কা লাগে পরের তিন ওভারেও। ১৬ থেকে ১৯ ওভার পর্যন্ত ৪ ওভারে মাত্র ২৮ রান করতে ৪ উইকেট হারায় ভারত।
পরে শেষ ওভারে নিশামের ওপর ঝড় বইয়ে দেন শিবাম দুবে। বাঁহাতি ব্যাটার ৩ চারের সঙ্গে ২টি ছক্কা মেরে শেষ ওভার থেকে নিয়ে নেন ২৪ রান। দলকে পার করে দেন আড়াইশ রানের ঘর। মাত্র ৮ বলে ২৬ রান করে অপরাজিত থাকেন দুবে।
ওভারে ৩ উইকেট নিলেও সব মিলিয়ে ৪ ওভারে ৪৬ রান খরচ করে ফেলেন নিশাম। ৪ ওভারে মাত্র ৩৩ রান খরচ করে নিউ জিল্যান্ডের সবচেয়ে কিপটে বোলার ছিলেন অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। আর ২ ওভারে ৪৮ রান দিয়ে সবচেয়ে খরুচে লকি ফার্গুসন।
রান তাড়ায় আর্শদিপ সিংয়ের প্রথম ওভারেই বিধ্বংসী ফিন অ্যালেনের ক্যাচ ছেড়ে দেন দুবে। পরের ওভারে হার্দিক পান্ডিয়ার বলে ২টি করে চার-ছক্কায় ২১ রান নিয়ে নেন আরেক ওপেনার টিম সেইফার্ট। মনে হচ্ছিল, সেমি-ফাইনালের মতোই ঝড় তুলবেন দুই ওপেনার।
কিন্তু তৃতীয় ওভারে আক্রমণে এসে বিপজ্জনক অ্যালেনকে ফেরান অক্ষর প্যাটেল। পরের ওভারের প্রথম বলেই রাচিন রবীন্দ্রকে আউট করে দেন জাসপ্রিত বুমরাহ। অনেকটা দৌড়ে সামনে লাফিয়ে চমৎকার ক্যাচ নেন ইশান।
নিজের পরের ওভারে গ্লেন ফিলিপ্সকে বোল্ড করে নিউ জিল্যান্ডকে আরও চাপে ফেলে দেন বাঁহাতি স্পিনার অক্ষর। পাওয়ার প্লেতে মাত্র ৫২ রান করতে ৩ উইকেট হারিয়ে রীতিমতো কোণঠাসাই হয়ে পড়ে কিউইরা।
তবে একপ্রান্ত আগলে রেখে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন সেইফার্ট। ২ চারের সঙ্গে ৫টি ছক্কা মেরে মাত্র ২৩ বলে ফিফটি করে ফেলেন উইকেটরক্ষক ব্যাটার। তবে এরপর আর ইনিংস টেনে বেশি দূর যেতে পারেননি তিনি।
বরুণ চক্রবর্তীর বলে ছক্কা মারতে গিয়ে ইশানের আরেকটি দুর্দান্ত ক্যাচে ফেরেন ২৬ বলে ৫২ রান করা সেইফার্ট। তার আগেই পান্ডিয়ার বলে বোল্ড হয়ে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন মার্ক চ্যাপম্যান। মাত্র ৭২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে যেন ছিটকেই যায় নিউ জিল্যান্ড।
ষষ্ঠ উইকেটে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন স্যান্টনার ও ড্যারেল মিচেল। দুজন মিলে মাত্র ২৮ বলে গড়েন ৫২ রানের জুটি। ১৩তম ওভারে অক্ষরের প্রথম বলে স্যান্টনারের সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন হার্দিক। তবে ওই ওভারেই ইশানের তৃতীয় ক্যাচ হয়ে ড্রেসিং রুমে ফেরেন ১১ বলে ১৭ রান করা মিচেল।
এরপর আর ম্যাচে তেমন কিছু বাকি ছিল না। নিজের শেষ স্পেলে বোলিং করতে এসে প্রথম ওভারে জিমি নিশাম ও ম্যাট হেনরিকে বোল্ড করেন বুমরাহ। পরের ওভারে ৪৩ রান করা স্যান্টনারকেও বোল্ড করেন অভিজ্ঞ পেসার।
পরে ১৯তম ওভারে অভিষেকের বলে জ্যাকব ডাফি ক্যাচ আউট হলে নিশ্চিত হয়ে যায় ভারতের শিরোপা।
ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ৪ ওভারে মাত্র ১৫ রান খরচ করে ৪ উইকেট নেন বুমরাহ। অক্ষরের শিকার ২৭ রানে ৩ উইকেট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ২০ ওভারে ২৫৫/৫ (স্যামসন ৮৯, অভিষেক ৫২, ইশান ৫৪, হার্দিক ১৮, সূর্যকুমার ০, তিলক ৮*, দুবে ২৬*; হেনরি ৪-০-৪৯-১, ফিলিপ্স ১-০-৫-০, ডাফি ৩-০-৪২-০, ফার্গুসন ২-০-৪৮-০, স্যান্টনার ৪-০-৩৩-০, রবীন্দ্র ২-০-৩২-১, নিশাম ৪-০-৪৬-৩)
নিউ জিল্যান্ড: ১৯ ওভারে ১৫৯ (সেইফার্ট ৫২, অ্যালেন ৯, রবীন্দ্র ১, ফিলিপ্স ৫, চ্যাপম্যান ৩, মিচেল ১৭, স্যান্টনার ৪৩, নিশাম ৮, হেনরি ০, ফার্গুসন ৬*, ডাফি ৩; আর্শদিপ ৪-০-৩২-০, হার্দিক ৪-০-৩৬-১, অক্ষর ৩-০-২৭-৩, বুমরাহ ৪-০-১৫-৪, বরুণ ৩-০-৩৯-১, অভিষেক ১-০-৫-১)
ফল: ভারত ৯৬ রানে জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
No posts available.
৯ মার্চ ২০২৬, ১০:১৬ এম

ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যক্তিগত মাইলফলক উদযাপনের সময় শেষ- এমনটাই মনে করেন ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। তার মতে, দলগত খেলায় আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত ট্রফি জেতা, ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়।
রোববার ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে গম্ভীর বলেন, ভারতের ক্রিকেটে এত দিন ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি যত দিন দায়িত্বে আছেন, তত দিন সেই আলোচনায় যেতে চান না।
গম্ভীরের কোচিংয়ে এরই মধ্যে দুটি আইসিসি ট্রফি ও একটি এশিয়া কাপ জিতেছে ভারত। গত বছরের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এসব দলীয় সাফল্য নিয়েই বেশি আলোচনা করতে চান তিনি।
“অনেক দিন ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে আমরা মাইলফলক নিয়ে কথা বলেছি। আমি আশা করি, আমি যত দিন আছি, তত দিন আমরা মাইলফলক নিয়ে কথা বলব না।”
আরও পড়ুন
| গ্রুপসেরা হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে দ. কোরিয়া, আশা বাঁচিয়ে রাখল ফিলিপাইন |
|
“আপনারা শেষ তিনটি ম্যাচ দেখলেই বুঝতে পারবেন। সঞ্জু কী করেছে- ৯৭*, ৮৯ ও ৮৯। যদি সে মাইলফলকের জন্য খেলত, হয়তো আমরা ২৫০ রান পেতাম না। তাই আপনাদের (গণমাধ্যমের) কাছেও আমার অনুরোধ- মাইলফলক নয়, ট্রফি উদ্যাপন করুন।”
সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল- দুই ম্যাচেই শতকের কাছাকাছি পৌঁছে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন ভারতের উইকেটকিপার-ব্যাটার সাঞ্জু স্যামসন। দুই দিনই তিনি শতকের মাত্র ১১ রান দূরে ছিলেন। তবে সেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সুবাদে দুই ম্যাচেই ভারতের দলীয় সংগ্রহ আড়াইশ ছাড়ায়।
গম্ভীরের মতে, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য এই মানসিকতাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
“কেউ যদি ৯৪ রানে থাকে, সে কি পরের বলেই ছক্কা মেরে শতক করতে সাহস দেখাবে, নাকি কয়েক বল ধরে একশতে পৌঁছানোর কথা ভাববে- এই প্রতিক্রিয়াই আসলে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খেলোয়াড়েরা অসাধারণভাবে সেটা করেছে।”
এসময় বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব গম্ভীর উৎসর্গ করেছেন তার তিন সাবেক সতীর্থ- রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষণ ও অজিত আগারকারকে।
“রাহুল ভাই ভারতের ক্রিকেটকে দারুণ অবস্থায় রেখে গেছেন। তার অবদানের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ভিভিএস লক্ষণও নিঃশব্দে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য অনেক কাজ করছেন, বিশেষ করে সেন্টার অব এক্সেলেন্সের মাধ্যমে। আর অজিত আগারকার- ও অনেক সমালোচনা সহ্য করে সততার সঙ্গে কাজ করছে।”

ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ এখনও টাটকা। তবে সেখানেই থামতে চান না অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। আহমেদাবাদে রোববারের ফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, তার পরের লক্ষ্য ২০২৮ অলিম্পিকে সোনা জয়।
নিউ জিল্যান্ডকে ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর সূর্যকুমার বলেন, গত এক মাসের যাত্রাটা দলের জন্য ছিল অসাধারণ। শুরুটা অবশ্য প্রত্যাশামতো হয়নি, তবে খেলাধুলায় এমনটা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত দল হিসেবে যা অর্জন করেছে, তার প্রতীক এখন তাদের হাতে থাকা ট্রফি। এখান থেকেই পরবর্তী লক্ষ্যও ঠিক করে ফেলেছেন সূর্যকুমার।
আরও পড়ুন
| স্বপ্নভঙ্গ থেকে বিশ্বকাপ নায়ক: স্যামসনের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন |
|
“পুরো যাত্রাটা আজ পর্যন্ত খুবই বিশেষ ছিল। দল হিসেবে আমরা যা অর্জন করেছি, সেটাই এখন সবার সামনে। এতে আমরা খুব খুশি। এখন আমাদের পরের লক্ষ্য অলিম্পিক স্বর্ণপদক।”
দীর্ঘ ১২৮ বছর পর আবার অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ সালের অলিম্পিকে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পুরুষ ও নারী- দুই বিভাগেই ছয়টি করে দল অংশ নেবে।
অলিম্পিক ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালের ১৪ থেকে ২৯ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের পোমোনা শহরে হবে সব ম্যাচ। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি অস্থায়ী ভেন্যু ফেয়ারগ্রাউন্ডস স্টেডিয়ামে।
বর্তমান টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী এশিয়া অঞ্চল থেকে ভারত পুরুষ ও নারী- দুই বিভাগেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য ভালো অবস্থানে রয়েছে।
এ মুহূর্তে ভারতীয় পুরুষ দল আইসিসির দুই বড় শিরোপার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন- আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। সূর্যকুমারের মতে, দলের বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ২০২৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর, যখন অধিনায়ক ছিলেন রোহিত শর্মা।
“২০২৪ সালের পর থেকেই সবকিছু বদলে যায়। তখন আমরা ভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলছিলাম। সেখান থেকেই বুঝতে পারি, এই দলকে সামনে এগোতে হলে কীভাবে খেলতে হবে। আমরা চাই ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯- এভাবেই জয়ের ধারা চালিয়ে যেতে।”

বছরের শুরুতে ভেঙে পড়া একজন ক্রিকেটার। আর দুই মাস না যেতেই বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক হয়ে ওঠা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সাঞ্জু স্যামসনের গল্প যেন নাটকীয় কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য।
গত জানুয়ারির শেষ দিন নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ত্রিভ্যান্ড্রামে নিজের ঘরের মাঠে দাঁড়িয়ে প্রায় স্বপ্নভঙ্গের মুহূর্ত দেখেছিলেন স্যামসন। ওপেনার-উইকেটকিপার হিসেবে বিশ্বকাপ একাদশে জায়গা চলে যায় ইশান কিষানের কাছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই ব্যাট হাতে খারাপ সময় কাটাচ্ছিলেন স্যামসন। এর মধ্যে দলীয় সমন্বয়ের কারণে তাকে মিডল অর্ডারেও নামানো হয়েছিল, যাতে ওপেনিংয়ে জায়গা করে দেওয়া যায় শুবমান গিলকে।
পরে নির্বাচকেরা আবার স্যামসনকে ওপেনিংয়ে ফেরালেও রানের দেখা ছিল না। সেই সুযোগেই জায়গা পাকা করেন ইশান। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে রোববার রাতে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক স্যামসন। টানা তিন ম্যাচে ৮০+ রান করে তিনিই জিতেছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার।
সাফল্যের এই স্বীকৃতি গ্রহণ করেন বছরের শুরুর দিকের কঠিন সময়ের কথাই মনে করলেন স্যামসন।
“নিউজিল্যান্ড সিরিজের পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম। পুরোপুরি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। মনে হচ্ছিল, ‘আমার স্বপ্নগুলো তো শেষ হয়ে গেল। এখন আমি আর কী করতে পারি?’”
বিশ্বকাপের শুরুতেও স্যামসনের জায়গা ছিল বেঞ্চে। গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচে অসুস্থ অভিষেক শর্মার বদলি হিসেবে সুযোগ পান তিনি। তবে পরে আবার বেঞ্চেই ফিরতে হয়। কিন্তু টপ অর্ডারের তিনজন বাঁহাতি হওয়ায় অফ স্পিনের বিপক্ষে সমস্যা হচ্ছিল। সেই কারণে দলে ফেরানো হয় স্যামসনকে।
ফিরেই আত্মবিশ্বাসের ঝলক দেখান তিনি, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেন ১৫ বলে ২৪ রান। তবে তার আসল বিস্ফোরণটা ঘটে ইডেন গার্ডেন্সে। সুপার এইটের ভার্চুয়াল নকআউট ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলেন ৫০ বলে ৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ভুগিয়ে করেছেন ৪২ বলে ৮৯ রান আর ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছেন ৪৬ বলে ৮৯ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস।
খারাপ সময় পাশ কাটিয়ে আলোয় ফেরার পথে তিনি পরামর্শ পেয়েছেন কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের কাছ থেকে।
“গত কয়েক মাস ধরে আমি নিয়মিত শচীন স্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম। অস্ট্রেলিয়া সফরে যখন দলের বাইরে বসে ছিলাম, তখন ভাবছিলাম- এখন আমার মানসিকতা কী হওয়া উচিত? তখনই আমি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।”
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিনও ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন টেন্ডুলকার।
“গতকালও তিনি ফোন করেছিলেন- আমি কেমন অনুভব করছি জানতে। তার মতো একজনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া- এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারি?”
এর আগে ২০২৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় স্কোয়াডেও ছিলেন স্যামসন, কিন্তু একটিও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। তবে তখন থেকেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলতে শুরু করেছিলেন স্টাইলিশ এই ওপেনিং ব্যাটার।
“ঈশ্বরের হয়তো অন্য পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে সুযোগ পেলাম আর দেশের জন্য যা পারি করেছি। এটা যেন স্বপ্নের মতো। কথায় বোঝানো কঠিন। ২০২৪ বিশ্বকাপে আমি একটি ম্যাচও খেলিনি, কিন্তু তখন থেকেই কল্পনা করতাম- একদিন এমন মুহূর্ত আসবে। সেই স্বপ্নের জন্যই কাজ করে গেছি।”

ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়েছে ভারত। একইসঙ্গে পরপর দুই বিশ্বকাপের ট্রফি নিজেদের করার কীর্তিও দেখিয়েছে তারা। সবচেয়ে তিনটি শিরোপার মালিক এখন তারাই।
এই ইতিহাস গড়া সাফল্যের বিশ্বাস ফাইনাল ম্যাচের আগের দিন থেকেই ছিল হার্দিক পান্ডিয়ার।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে ভারতের সামনে পাত্তা পায়নি নিউ জিল্যান্ড। রোববারের ম্যাচটিতে আগে ব্যাট করে ২৫৫ রানের পাহাড়ে উঠে বসে ভারত। জবাবে মাত্র ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায় কিউইরা।
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিততে পেরে আনন্দের সীমা নেই হার্দিকের। ম্যাচ শেষে সেই অনুভূতিরই জানান দেন ভারতের তারকা অলরাউন্ডার।
“(ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতা) এটি অনেকটা ইমোশনাল। কারণ ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ জেতা, সবার উত্তেজনা, রোমাঞ্চ অসাধারণ। এখন মনে হচ্ছে আমরা সহজেই জিতে গিয়েছি। কিন্তু আমরা যে এফোর্ট দিয়েছি... গতকাল থেকেই আমি জানতাম যে, আমরা চ্যাম্পিয়ন।”
গত তিন বছরের মধ্যে হার্দিকের এটি তৃতীয় আইসিসি ট্রফি। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। আর ২০২৫ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়েই ট্রফি ঘরে তুলেছিল তারা।
এবার আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে হার্দিক জানিয়েছেন, অন্তত ১০টি শিরোপা জিততে চান তিনি।
“আমার মধ্যে আরও ১০ বছর বাকি আছে ক্রিকেট খেলার। আমার অর্ধেক ক্যারিয়ার শেষ। আরও অর্ধেক বাকি আছে। আমি অন্তত ১০টি শিরোপা জিততে চাই, আইসিসি ও আইপিএল মিলিয়ে। তবে আমার জন্য আইসিসি ট্রফির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।”
“আমি এরই মধ্যে ৩টি ট্রফি জিতেছি। সামনে যে টুর্নামেন্টই খেলব, আমি জিততে চাই। তো আমি মনে করি, সামনের ১০ বছরে আরও অন্তত ৫-৬টি শিরোপা আসবে। এটিই আমার লক্ষ্য।”

প্রথম পাঁচ ম্যাচে সুযোগ পেয়েছেন মাত্র একটিতে। মনে হচ্ছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সামনের কোনো হয়তো আর সুযোগ পাবেন না সাঞ্জু স্যামসন। এর মধ্যেই এলো রিঙ্কু সিংয়ের বাবার অসুস্থতার খবর, একাদশে ঢুকে গেলেন স্যামসন। আর এই সুযোগটিই দুই হাতে নিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার।
সুযোগটি শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক গড়তেই নয়, ভারতকে বিশ্বকাপ জেতাতেই কাজে লাগালেন ৩১ বছর বয়সী ব্যাটার। নিউ জিল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে শিরোপা জেতার পথে ফাইনাল ম্যাচে তিনি খেলেছেন ৮৯ রানের ইনিংস। এর আগের দুই ম্যাচে ছিলেন প্লেয়ার অব ম্যাচ!
সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে ৪ ম্যাচ বেঞ্চে বসে থাকলেও, শেষ দিকে সুযোগ পেয়ে স্যামসনই হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার। ভারতের ইতিহাস গড়া শিরোপা জয়ে তার হাতেই উঠেছে প্লেয়ার অব দা টুর্নামেন্ট পুরস্কার।
বিশ্বকাপে ভারতের দ্বিতীয় ম্যাচে নামিবিয়ার বিপক্ষে প্রথম সুযোগ পান স্যামসন। সেদিন ৮ বলে ২২ রান করলেও পরের তিন ম্যাচে আর নামানো হয়নি তাকে। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ফেরা। সেদিন তিনি খেলেন ১৫ বলে ২৪ রানের ইনিংস।
তখনও বোঝার উপায় ছিল না, নিজের ঝুলিতে কী জমা রেখেছেন স্যামসন। সুপার এইটের শেষ ম্যাচে ভারতের বাঁচা-মরার লড়াইয়ে লক্ষ্য ছিল ১৯৬ রানের। সেদিন ১২ চারের ৪ ছক্কায় ৫০ বলে ৯৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে জেতান স্যামসন।
সেই ছন্দ ধরে রাখেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমি-ফাইনাল ম্যাচেও। সেদিন তার ৮ চার ও ৭ ছক্কায় ৪২ বলে ৮৯ রানের সৌজন্যে ২৫৩ রানে পৌঁছায় ভারত। পরে জাসপ্রিত বুমরাহর দুর্দান্ত বোলিংয়ে ফাইনালে উঠে যায় ভারত। এই দুই ম্যাচেই স্যামসন পান ম্যাচ সেরার পুরস্কার।
ধারাবাহিকতার নজির তিনি রাখেন ফাইনাল ম্যাচেও। কিউই বোলারদের পিটিয়ে ৫ চারের সঙ্গে ৮ ছক্কায় এদিন তিনি করেন ৪৬ বলে ৮৯ রান। পরপর তিন ম্যাচেই তার ব্যাট থেকে আসে ৮০ ছাড়ানো ইনিংস। বুমরাহ ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে জেতেন ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি।
তবে সব মিলিয়ে মাত্র ৫ ম্যাচে ১৯৯.৩৭ স্ট্রাইক রেট ও ৮০.২৫ গড়ে ৩২১ রান করে স্যামসনই হন এই টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার। ভারতের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি। আগের দুজন- বিরাট কোহলি (২০১৪ ও ২০১৬) ও বুমরাহ (২০২৪)।
টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটার হওয়ার পথে ২৪টি ছক্কা মেরেছেন স্যামসন। বিশ্বকাপের এক আসরে এটিই সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড। এছাড়া বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালে ফিফটি করা বিশ্বের মাত্র তৃতীয় ব্যাটার স্যামসন। আগের দুজন শহিদ আফ্রিদি (২০০৯) ও বিরাট কোহলি (২০১৪)।