
১৯৭৪ সালের সেই জার্মানি বিশ্বকাপ। ফুটবলের মানচিত্রে তখন এক নতুন বিপ্লবের নাম ‘টোটাল ফুটবল’। আর সেই মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজনই—ইয়োহান ক্রুইফ। তাঁর খেলার ধরন কেবল ফুটবল ছিল না, ছিল যেন মাঠের ক্যানভাসে আঁকা এক জীবন্ত জ্যামিতি।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাকি আর ৩৩ দিন। বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ এলে ক্রুইফের অবিশ্বাস্য কীর্তিও সতেজ হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের হয়ে ক্রুইফ ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। এক বিশ্বকাপে কোনো একক খেলোয়াড়ের তৈরি করা সর্বোচ্চ সুযোগের রেকর্ড এটি, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। এমনকি ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনাও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ২৭টি সুযোগ তৈরি করে ক্রুইফের পেছনে পড়ে আছেন।
গল্পটা শুরু হয় সেই কমলা রঙের জার্সি গায়ে এক ‘উড়ন্ত ডাচম্যানের’ অবিশ্বাস্য দাপট দিয়ে। ক্রুইফ মাঠে থাকা মানেই ছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক গোলকধাঁধা। বল পায়ে নিয়ে যখন তিনি ছুটতেন, মনে হতো ঘাসের ওপর দিয়ে কোনো জাদুকর হেঁটে যাচ্ছেন। সেই বিশ্বকাপে তিনি ৭ ম্যাচে ৩টি গোল করেছিলেন, ৩ গোলে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু পরিসংখ্যান দিয়ে ক্রুইফকে বোঝা অসম্ভব।
সুইডেনের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের কথা ভাবুন। মাঠের এক কোণে বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রুইফ, সামনে সুইডিশ ডিফেন্ডার ওলসন। হঠাৎ শরীরের এক মোচড়ে বলটিকে নিজের পায়ের পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে নিলেন—জন্ম নিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কারুকার্য ‘ক্রুইফ টার্ন’। সেই ম্যাচে তিনি রেকর্ড ১২টি সফল ড্রিবলিং করেছিলেন। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি ড্রিবলিং করতে পেরেছেন কেবল তিনজন— ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে নাইজেরিয়ার তারকা জে-জে ওকোচা (১৫টি), ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জাইরজিনহো ১৩টি সফল ড্রিবলিং করেছিলেন উরুগুয়ের বিপক্ষে এবং ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের পল গ্যাসকোয়েন (১৩টি)।
ক্রুইফ কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন মাঠের ভেতর একজন কোচ! তিনি জানতেন কখন কাকে কোথায় পাস দিতে হবে, কখন নিজে আক্রমণ করতে হবে। তাঁর ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরির পরিসংখ্যানই বলে দেয়, তিনি গোল করার চেয়ে গোল করানোর কারিগর হিসেবে কতটা নিখুঁত ছিলেন। তবে আক্ষেপও কম ছিল না ক্রুইফের নেদারল্যান্ডস শিরোপার কাছাকাছি গিয়েও ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানির কাছে।
ফুটবল আসবে, ফুটবল যাবে; কিন্তু সেই সরু গড়নের ডাচ ফুটবলারের পায়ের জাদু আর টোটাল ফুটবলের সোনালী দিনগুলো চিরকাল ফুটবল অমর হয়ে থাকবে। ক্রুইফ মানেই সেই অমর সৃষ্টিশীলতা, যা আজও ফুটবলকে সুন্দর ও শৈল্পিক করে রেখেছে।
No posts available.