১৩ অক্টোবর ২০২৫, ৬:৪১ পিএম

গড়পড়তা অন্য অনেকের চেয়ে খানিক দেরিতেই স্বীকৃত ক্রিকেটে পথচলা শুরু মোহাম্মদ রুবেলের। বয়সের কাটা ২৯ পেরোনোর পর এই রহস্য স্পিনার খেললেন এনসিএল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে। চট্টগ্রামের হয়ে নিজের প্রথম সংস্করণেই করলেন বাজিমাত। চট্টগ্রামের বিভাগের হয়ে ৮ ম্যাচে ৫.২১ ইকোনমি রেটে নিয়েছেন ১০ উইকেট। নজরকাড়া পারফরম্যান্সে হাতে তুলেছেন ‘মোস্ট প্রমিজিং ক্রিকেটার’ পুরস্কার।
এই পর্যায়ে আসতে রুবেলকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ লম্বা সময়। ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে খেলেছেন প্রায় ৭ মৌসুম। তারপর সাধারণ অফ স্পিনার থেকে নিজেকে ভেঙে, গড়েছেন রহস্য স্পিনার হিসেবে। বদলে যাওয়ার ছাপ রেখেছেন এনসিএল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টেও। অফ স্পিনের সঙ্গে ক্যারম বল, লেগ স্পিনের মিশেলের ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষাই নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম ফাইনালে জায়গা করতে না পারলেও নিজেকে নিংড়ে দিয়ে রুবেল পেয়েছেন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের খেতাব। এনসিএলে শেষে ব্যক্তিগত সাফল্য, বোলিংয়ে পরিবর্তন, দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগ লিগে সুযোগ তৈরি, সব মিলিয়ে একজন পেশাদার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে টি স্পোর্টসের সঙ্গে কথা বলছেন রুবেল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ক্রিকেট করেসপন্ডেন্ট শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ।
টি স্পোর্টস: শেষ থেকেই শুরু করি। প্রথমবার স্বীকৃত ক্রিকেট খেললেন। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের পুরস্কারও জিতলেন। সব মিলিয়ে আপনার এই পথচলাটা কেমন ছিল?
মোহাম্মদ রুবেল: এত বড় জায়গায় প্রথমবার খেলব। খুব রোমাঞ্চিত ছিলাম। একইসঙ্গে আত্মবিশ্বাসীও ছিলাম, যদি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই তাহলে ভালো কিছু করতে পারব।
অধিনায়ক থেকে শুরু করে দলের সবাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। সিনিয়র ক্রিকেটার, সাপোর্ট স্টাফ, সবার থেকে অনেক সাহস পেয়েছি। আমার যেহেতু প্রথমবার ছিল, এমন সমর্থন পাওয়ায় ভালো কিছু করাটা সহজ হয়ে গেছে। এটাই আমার জন্য বড় পাওয়া ছিল, এমন সহায়ক একটা দল।
টি স্পোর্টস: এনসিএলের জন্য প্রস্তুতিটা কীভাবে নিয়েছেন?
রুবেল: এনসিএলের আগে চট্টগ্রামে এক মাসের ক্যাম্প হয়েছে। তখন থেকেই আমাকে অধিনায়ক বা সিনিয়র ক্রিকেটাররা বলেছেন, আমি শুরু থেকে এনসিএল খেলার সুযোগ পাব। তাই সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি।
টি স্পোর্টস: চট্টগ্রাম দলে নাঈম হাসানের মতো অফ স্পিনার আছেন। সচরাচর দুজন অফ স্পিনার একসঙ্গে খেলে না। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে দলের পক্ষ থেকে কেমন বার্তা পেয়েছিলেন?
রুবেল: আমার ট্যাগটা অফ স্পিনার ঠিক আছে, তবে আমি ভ্যারিয়েশন একটু বেশি ব্যবহার করি। গতানুগতিক অফ স্পিনের মতো করি না। এ কারণে হয়তো সুযোগটা একটু বেশি ছিল। নাঈম অফ স্পিনার হিসেবে খেলবে আর আমি অনেকটা মিস্ট্রি স্পিনারের মতো। সেরকমভাবেই আমাকে বলে রেখেছিল। আমিও সেভাবে প্রস্তুত হয়েছি। সেই হিসেব করেই খেললাম।
প্রথম ম্যাচে উইকেট ১টা পেয়েছি, তবে মাত্র ১৬ রান দিয়েছি। সেই ম্যাচের পরই আসলে আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে গেছে। সেখান থেকে চেষ্টা করেছি যত ভালো করা যায়। রাজশাহীর বিপক্ষে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হলাম। অধিনায়কও আমার ওপর খুব আস্থা রেখেছেন, যখন প্রয়োজন আমি বল করতে পারব। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। প্রথম বছর খেলতে এসেই এই ভরসাটা দিতে পেরেছি, ভালো কিছু করেছি।
টি স্পোর্টস: একটু পেছনে ফিরি। বছরের শুরুতে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে ১৫ ম্যাচে ৪৩ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন। তারপর চট্টগ্রামের রিজিওনাল টি-টোয়েন্টিতে ১৫ উইকেট নিয়ে আবার টপ হলেন। এবার এনসিএলেও ভালো করলেন। বছরটা কী নিজের মনে হচ্ছে?
রুবেল: ২০২৫ সালটা অবশ্যই সব দিক দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে। শুধু এই বছর বলব না, ২০২৩-২৪ মৌসুমের সেকেন্ড ডিভিশন থেকেই সামনের দিকে আছি। সেবার ১৬ ম্যাচে ৩৭ উইকেট নিয়ে সবার ওপরে ছিলাম। তারপর ২০২৪-২৫ মৌসুমে ফার্স্ট ডিভিশনেও সর্বোচ্চ উইকেট। চট্টগ্রামের রিজিওনাল টি-টোয়েন্টিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার এনসিএলও খেললাম।
টি স্পোর্টস: যেটা বলছিলেন, আপনি অনেক বৈচিত্র্য ব্যবহার করেন বোলিংয়ে। এনসিএলেও আমরা দেখলাম ক্যারম বল করছেন, একই অ্যাকশনে লেগ স্পিন করছেন। এসব রপ্ত করলেন কীভাবে?
রুবেল: আমি আগে নরমাল অফ স্পিনই করতাম। কিন্তু ২০২৩-২৪ মৌসুমের সেকেন্ড ডিভিশন শুরুর ২ মাস আগে আমার মনে হলো, যদি নরমাল অফ স্পিনই করি, তাহলে বেশি ওপরে খেলতে পারব না। একটা জায়গায়ই আটকে থাকতে হবে। তাই একটু ভিন্ন চিন্তা করলাম, ভ্যারিয়েশন আনার কথা ভাবলাম।
তো ওই মোটামুটি ২ মাসের মধ্যেই আমি সব রপ্ত করি। ক্যারম বল, লেগ স্পিন, ব্যাক স্পিন- যা কিছুই পারি, ২ মাসের মধ্যেই সব কিছু আয়ত্তে এনেছি। তারপর সেকেন্ড ডিভিশনে গিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হলাম। আর ফার্স্ট ডিভিশনে খেললাম। তারপর থেকে আল্লাহর রহমতে চলছে।
টি স্পোর্টস: রহস্য স্পিনার হওয়াটা তো সবসময়ই ঝুঁকির ব্যাপার...
রুবেল: আমি টানা ৭ বছর সেকেন্ড ডিভিশন লিগ খেলেছি। তেমন খারাপ করতাম না। ভালো ইকোনমি রেটে প্রতি বছর ২০-২১ উইকেট হয়তো নিতাম। তবে কখনও টপে থাকতে পারতাম না। এখন ভালো জায়গায় খেলতে তো ঝুঁকি নিতে হবে।
তাই ভাবলাম, ঝুঁকি নিয়েই দেখি। সফল হলে তো ভালো। নইলে আগের জায়গায়ই ফিরে যাব। এই চিন্তা থেকেই ২ মাসে সব ট্রাই করলাম। এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ সব কিছু আমার নিয়ন্ত্রণে আছে।
টি স্পোর্টস: রহস্য স্পিনারদের ক্ষেত্রে প্রায়ই একটা জিনিস দেখা যায় যে, অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বাংলাদেশের সঞ্জিত সাহা দ্বীপ, আলিস আল ইসলাম বা বিশ্বের অন্যতম সেরা স্পিনার সুনিল নারাইনকেও অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন শুনতে হয়েছে। আপনি কখনও এসবের সম্মুখীন হয়েছেন?
রুবেল: এখন পর্যন্ত বোলিং অ্যাকশন নিয়ে সেভাবে কারো থেকে কিছু শুনতে হয়নি। রহস্য স্পিনার হওয়ায় এই ঝুঁকিটা আছে আমি জানি। সামনে আরো যত বড় জায়গায় খেলব, আরো বেশি খুঁটিয়ে দেখা হবে হয়তো। এ ছাড়া অনেকে আবার ঈর্ষাবশতও অনেক কথা বলে।
তবে আমি সব কিছুর জন্যই আমি প্রস্তুত আছি। কখনো যদি প্রশ্নের মুখে পড়ি, তাহলে পরীক্ষা দিয়ে আবার আসব। যতক্ষণ পর্যন্ত জানি যে, আমার বোলিং অ্যাকশন ঠিক আছে, ততক্ষণ আমার কোনো ভয় বা চিন্তা নেই। সামনে যা আসুক, ওভারকাম করতে পারব।
টি স্পোর্টস: আপনার বয়স এরই মধ্যে ২৯ পেরিয়ে গেছে। তুলনামূলক বেশ দেরিতে স্বীকৃত ক্রিকেটে পথচলা শুরু করলেন। এর আগের পথটা কেমন ছিল?
রুবেল: চট্টগ্রামে শতাব্দী ক্রিকেট একাডেমিতে আবু বকর সিদ্দিক ভাইয়ের কোচিংয়ে আমার শুরু। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৮ বয়সভিত্তিক ট্রায়ালে গিয়েছিলাম। তখন বয়সের কারণে বাদ পড়ে যাই। তারপর বকর ভাইয়ের কাছে যাই। তখনও চট্টগ্রামে ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন কিছুই খেলিনি। একদম নতুন ছিলাম। টেপ টেনিস খেলতাম। ক্রিকেট বলে সেভাবে খেলিনি।
শতাব্দী একাডেমিতে যাওয়ার পর বকর ভাই আমার প্রতিভা দেখেই হয়তো সরাসরি চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে নিয়ে নেন। তখন থেকেই মূলত আমার শুরু। চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার লিগে বড় বড় প্লেয়াররা খেলতেন। তাদের সঙ্গে খেলে সিরিয়াস ক্রিকেটটা শুরু।
টি স্পোর্টস: চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার ক্রিকেটে কবে এলেন?
রুবেল: শুরুতে আমি আসলে ব্যাটার ছিলাম। ২০১৪-১৫ মৌসুমের চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে আমি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেছিলাম। আমার এক বড় ভাই আছেন, তিনি বললেন, ‘তুই তো প্রিমিয়ার লিগে ভালো খেলছিস, তোকে আমি ঢাকায় নিয়ে যাব।’ ২০১৫-১৬ মৌসুমে আমি সেকেন্ড ডিভিশনের ক্লাব মিরপুর বয়েজ ক্রিকেট ক্লাবে যাই। প্রথমে ট্রায়াল নেয়। কিন্তু সেখানে তাদের পছন্দ হয়নি। বেশি বল খেলার সুযোগও পাইনি নেটে।
আমাকে অন্য আরেকটা দল থেকেও বলছিল। তবে মিরপুর বয়েজে চট্টগ্রামের আরো ৫-৬ জন থাকায় সেখানেই যাই। ট্রায়ালে বাদ দেওয়ার পর বড় ভাইরা ক্লাবের কর্মকর্তাদের বললেন, ‘ভাই ওরে বাদ দিয়েন না। প্রয়োজনে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলান। ভালো খেললে রাখবেন। খারাপ খেললে তো নেই।’ ওনারা সিনিয়র প্লেয়ার ছিলেন সেই দলের, তাই ওনাদের কথা রাখলেন।
তারপর ফতুল্লার আউটার মাঠে একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলি। সেদিন ৬ ওভারে ১০ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিই। আবার ব্যাটিংয়ে সাত নম্বরে নেমে ১৭ বলে করি ৪৫ রান। সেখান থেকেই ঢাকা লিগে শুরু। এখন সম্পর্কটা এমন হয়ে গেছে, মিরপুর বয়েজ দলটা সাজাতে আমার অনেক ইনপুট থাকে। ক্লাবের কর্তারা অনেক ভরসা করে আমার ওপর।
২০২৩-২৪ মৌসুমে যখন সর্বোচ্চ উইকেট নিলাম, তখন ক্লাবের কর্তারাই আমাকে বললেন, তুই যেহেতু সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছিস, সেকেন্ড ডিভিশন আর খেলিস না। এবার ফার্স্ট ডিভিশন খেল। সর্বোচ্চ উইকেট পাইছিস, এখন ফার্স্ট ডিভিশন দলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবি।
টি স্পোর্টস: প্রথম বিভাগে তো শুধু ম্যাচই খেললেন না, আবারও সবার ওপরে ছিলেন...
রুবেল: সেকেন্ড ডিভিশন শেষ হওয়ার পর আমাকে ৫-৬টা দল থেকে কল করেছে। তুলনামূলক দ্বিগুণ টাকাও দেবে বলেছে। তবে দলের পরিবেশ ও বাকি সব কিছু মিলিয়ে অর্ধেক টাকায় গাজী টায়ার্স ক্রিকেট একাডেমিতে খেলতে রাজি হয়ে যাই। দলের পরিবেশই মূল। সেটা ভালো পাওয়ায় পারফরম্যান্সও ভালো হলো। সেখান থেকেই এখন আলহামদুলিল্লাহ চলছে।
টি স্পোর্টস: স্বীকৃত ক্রিকেটে প্রথম টুর্নামেন্টে ভালো করলেন। সামনের সময় নিয়ে কী ভাবছেন?
রুবেল: সামনে তো এখন এনসিএলের চার দিনের টুর্নামেন্ট আছে। দলে সুযোগ পেলে অবশ্যই ভালো করার চেষ্টা করব। আর বিপিএল খেলার ইচ্ছা তো সবারই থাকে। যদি প্লেয়ার্স ড্রাফটে নাম থাকে, কোনো দলে সুযোগ পাই, তাহলে আত্মবিশ্বাস আছে ভালো করার। নিজের সবটা দিয়েই চেষ্টা করব।
No posts available.

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের একতরফা জয়ের পর ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে চলছে নানা রকমের আলোচনা। অনেকেই ভারতের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করলেও, ভিন্ন সুর শোনা গেছে পাকিস্তানের সাবেক গতিতারকা শোয়েব আখতারের কণ্ঠে।
তার দাবি, ভারতের উত্থান মূলত ক্রিকেটকে শেষ করে দিয়েছে। বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের সামনে পাত্তাই পায়নি নিউ জিল্যান্ড। দুর্দান্ত ব্যাটিং-বোলিংয়ে কিউইদের ৯৬ রানে হারায় স্বাগতিকরা। এটি ছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের রেকর্ড তৃতীয় শিরোপা।
বেশিরভাগ ক্রিকেট বিশ্লেষক যেখানে ভারতের নিখুঁত পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন, সেখানে ভিন্ন পথে হাঁটলেন শোয়েব আখতার। পাকিস্তানি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ট্যাপম্যাডের অনুষ্ঠান গেম অন হ্যায় অনুষ্ঠানে তিনি ভারতের দাপটকে তুলনা করেন পাড়ার খেলায় ধনী শিশুর সঙ্গে।
আরও পড়ুন
| আফঈদা-মিলিদের সমীহ করছে উজবেকিস্তান |
|
“পাড়া-মহল্লায় সবসময় একজন ধনী ছেলে থাকে, সে গরিব বাচ্চাদের ডেকে বলে- চলো ক্রিকেট খেলি, তবে জিতব কিন্তু আমিই। ভারত আমাদের সঙ্গে ঠিক সেটাই করছে।”
“আট দলের মধ্যে চারটি রাখে, তারপর আবার সেখান থেকে তিনটিকে ডাকে ও সামনে এগিয়ে যায়। শেষে বলে- দেখো, আমি জিতে গেছি। তারা পুরো ক্রিকেটটাই শেষ করে দিয়েছে।”
তার এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ভক্তই ভারতের বড় জয়ের পর এমন মন্তব্যকে তিক্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।
তবে ফাইনালের আগে আখতারের সুর ছিল কিছুটা ভিন্ন। ভারতকে ফেভারিট মানলেও তিনি বলেছিলেন, ক্রিকেটের স্বার্থে নিউ জিল্যান্ডের জেতা উচিত। তার মতে, ভারতের ওপর ১৫০ কোটির বেশি মানুষের প্রত্যাশার চাপ থাকে এবং বড় ফাইনালে সেই চাপ কখনও কখনও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যক্তিগত মাইলফলক উদযাপনের সময় শেষ- এমনটাই মনে করেন ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। তার মতে, দলগত খেলায় আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত ট্রফি জেতা, ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়।
রোববার ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে গম্ভীর বলেন, ভারতের ক্রিকেটে এত দিন ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি যত দিন দায়িত্বে আছেন, তত দিন সেই আলোচনায় যেতে চান না।
গম্ভীরের কোচিংয়ে এরই মধ্যে দুটি আইসিসি ট্রফি ও একটি এশিয়া কাপ জিতেছে ভারত। গত বছরের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এসব দলীয় সাফল্য নিয়েই বেশি আলোচনা করতে চান তিনি।
“অনেক দিন ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে আমরা মাইলফলক নিয়ে কথা বলেছি। আমি আশা করি, আমি যত দিন আছি, তত দিন আমরা মাইলফলক নিয়ে কথা বলব না।”
আরও পড়ুন
| গ্রুপসেরা হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে দ. কোরিয়া, আশা বাঁচিয়ে রাখল ফিলিপাইন |
|
“আপনারা শেষ তিনটি ম্যাচ দেখলেই বুঝতে পারবেন। সঞ্জু কী করেছে- ৯৭*, ৮৯ ও ৮৯। যদি সে মাইলফলকের জন্য খেলত, হয়তো আমরা ২৫০ রান পেতাম না। তাই আপনাদের (গণমাধ্যমের) কাছেও আমার অনুরোধ- মাইলফলক নয়, ট্রফি উদ্যাপন করুন।”
সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল- দুই ম্যাচেই শতকের কাছাকাছি পৌঁছে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন ভারতের উইকেটকিপার-ব্যাটার সাঞ্জু স্যামসন। দুই দিনই তিনি শতকের মাত্র ১১ রান দূরে ছিলেন। তবে সেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সুবাদে দুই ম্যাচেই ভারতের দলীয় সংগ্রহ আড়াইশ ছাড়ায়।
গম্ভীরের মতে, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য এই মানসিকতাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
“কেউ যদি ৯৪ রানে থাকে, সে কি পরের বলেই ছক্কা মেরে শতক করতে সাহস দেখাবে, নাকি কয়েক বল ধরে একশতে পৌঁছানোর কথা ভাববে- এই প্রতিক্রিয়াই আসলে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খেলোয়াড়েরা অসাধারণভাবে সেটা করেছে।”
এসময় বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব গম্ভীর উৎসর্গ করেছেন তার তিন সাবেক সতীর্থ- রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষণ ও অজিত আগারকারকে।
“রাহুল ভাই ভারতের ক্রিকেটকে দারুণ অবস্থায় রেখে গেছেন। তার অবদানের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ভিভিএস লক্ষণও নিঃশব্দে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য অনেক কাজ করছেন, বিশেষ করে সেন্টার অব এক্সেলেন্সের মাধ্যমে। আর অজিত আগারকার- ও অনেক সমালোচনা সহ্য করে সততার সঙ্গে কাজ করছে।”

ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ এখনও টাটকা। তবে সেখানেই থামতে চান না অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। আহমেদাবাদে রোববারের ফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, তার পরের লক্ষ্য ২০২৮ অলিম্পিকে সোনা জয়।
নিউ জিল্যান্ডকে ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর সূর্যকুমার বলেন, গত এক মাসের যাত্রাটা দলের জন্য ছিল অসাধারণ। শুরুটা অবশ্য প্রত্যাশামতো হয়নি, তবে খেলাধুলায় এমনটা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত দল হিসেবে যা অর্জন করেছে, তার প্রতীক এখন তাদের হাতে থাকা ট্রফি। এখান থেকেই পরবর্তী লক্ষ্যও ঠিক করে ফেলেছেন সূর্যকুমার।
আরও পড়ুন
| স্বপ্নভঙ্গ থেকে বিশ্বকাপ নায়ক: স্যামসনের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন |
|
“পুরো যাত্রাটা আজ পর্যন্ত খুবই বিশেষ ছিল। দল হিসেবে আমরা যা অর্জন করেছি, সেটাই এখন সবার সামনে। এতে আমরা খুব খুশি। এখন আমাদের পরের লক্ষ্য অলিম্পিক স্বর্ণপদক।”
দীর্ঘ ১২৮ বছর পর আবার অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ সালের অলিম্পিকে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পুরুষ ও নারী- দুই বিভাগেই ছয়টি করে দল অংশ নেবে।
অলিম্পিক ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালের ১৪ থেকে ২৯ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের পোমোনা শহরে হবে সব ম্যাচ। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি অস্থায়ী ভেন্যু ফেয়ারগ্রাউন্ডস স্টেডিয়ামে।
বর্তমান টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী এশিয়া অঞ্চল থেকে ভারত পুরুষ ও নারী- দুই বিভাগেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য ভালো অবস্থানে রয়েছে।
এ মুহূর্তে ভারতীয় পুরুষ দল আইসিসির দুই বড় শিরোপার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন- আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। সূর্যকুমারের মতে, দলের বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ২০২৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর, যখন অধিনায়ক ছিলেন রোহিত শর্মা।
“২০২৪ সালের পর থেকেই সবকিছু বদলে যায়। তখন আমরা ভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলছিলাম। সেখান থেকেই বুঝতে পারি, এই দলকে সামনে এগোতে হলে কীভাবে খেলতে হবে। আমরা চাই ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯- এভাবেই জয়ের ধারা চালিয়ে যেতে।”
৯ মার্চ ২০২৬, ১০:১৬ এম

বছরের শুরুতে ভেঙে পড়া একজন ক্রিকেটার। আর দুই মাস না যেতেই বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক হয়ে ওঠা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সাঞ্জু স্যামসনের গল্প যেন নাটকীয় কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য।
গত জানুয়ারির শেষ দিন নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ত্রিভ্যান্ড্রামে নিজের ঘরের মাঠে দাঁড়িয়ে প্রায় স্বপ্নভঙ্গের মুহূর্ত দেখেছিলেন স্যামসন। ওপেনার-উইকেটকিপার হিসেবে বিশ্বকাপ একাদশে জায়গা চলে যায় ইশান কিষানের কাছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই ব্যাট হাতে খারাপ সময় কাটাচ্ছিলেন স্যামসন। এর মধ্যে দলীয় সমন্বয়ের কারণে তাকে মিডল অর্ডারেও নামানো হয়েছিল, যাতে ওপেনিংয়ে জায়গা করে দেওয়া যায় শুবমান গিলকে।
পরে নির্বাচকেরা আবার স্যামসনকে ওপেনিংয়ে ফেরালেও রানের দেখা ছিল না। সেই সুযোগেই জায়গা পাকা করেন ইশান। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে রোববার রাতে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক স্যামসন। টানা তিন ম্যাচে ৮০+ রান করে তিনিই জিতেছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার।
সাফল্যের এই স্বীকৃতি গ্রহণ করেন বছরের শুরুর দিকের কঠিন সময়ের কথাই মনে করলেন স্যামসন।
“নিউজিল্যান্ড সিরিজের পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম। পুরোপুরি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। মনে হচ্ছিল, ‘আমার স্বপ্নগুলো তো শেষ হয়ে গেল। এখন আমি আর কী করতে পারি?’”
বিশ্বকাপের শুরুতেও স্যামসনের জায়গা ছিল বেঞ্চে। গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচে অসুস্থ অভিষেক শর্মার বদলি হিসেবে সুযোগ পান তিনি। তবে পরে আবার বেঞ্চেই ফিরতে হয়। কিন্তু টপ অর্ডারের তিনজন বাঁহাতি হওয়ায় অফ স্পিনের বিপক্ষে সমস্যা হচ্ছিল। সেই কারণে দলে ফেরানো হয় স্যামসনকে।
ফিরেই আত্মবিশ্বাসের ঝলক দেখান তিনি, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেন ১৫ বলে ২৪ রান। তবে তার আসল বিস্ফোরণটা ঘটে ইডেন গার্ডেন্সে। সুপার এইটের ভার্চুয়াল নকআউট ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলেন ৫০ বলে ৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ভুগিয়ে করেছেন ৪২ বলে ৮৯ রান আর ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছেন ৪৬ বলে ৮৯ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস।
খারাপ সময় পাশ কাটিয়ে আলোয় ফেরার পথে তিনি পরামর্শ পেয়েছেন কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের কাছ থেকে।
“গত কয়েক মাস ধরে আমি নিয়মিত শচীন স্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম। অস্ট্রেলিয়া সফরে যখন দলের বাইরে বসে ছিলাম, তখন ভাবছিলাম- এখন আমার মানসিকতা কী হওয়া উচিত? তখনই আমি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।”
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিনও ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন টেন্ডুলকার।
“গতকালও তিনি ফোন করেছিলেন- আমি কেমন অনুভব করছি জানতে। তার মতো একজনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া- এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারি?”
এর আগে ২০২৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় স্কোয়াডেও ছিলেন স্যামসন, কিন্তু একটিও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। তবে তখন থেকেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলতে শুরু করেছিলেন স্টাইলিশ এই ওপেনিং ব্যাটার।
“ঈশ্বরের হয়তো অন্য পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে সুযোগ পেলাম আর দেশের জন্য যা পারি করেছি। এটা যেন স্বপ্নের মতো। কথায় বোঝানো কঠিন। ২০২৪ বিশ্বকাপে আমি একটি ম্যাচও খেলিনি, কিন্তু তখন থেকেই কল্পনা করতাম- একদিন এমন মুহূর্ত আসবে। সেই স্বপ্নের জন্যই কাজ করে গেছি।”

ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়েছে ভারত। একইসঙ্গে পরপর দুই বিশ্বকাপের ট্রফি নিজেদের করার কীর্তিও দেখিয়েছে তারা। সবচেয়ে তিনটি শিরোপার মালিক এখন তারাই।
এই ইতিহাস গড়া সাফল্যের বিশ্বাস ফাইনাল ম্যাচের আগের দিন থেকেই ছিল হার্দিক পান্ডিয়ার।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে ভারতের সামনে পাত্তা পায়নি নিউ জিল্যান্ড। রোববারের ম্যাচটিতে আগে ব্যাট করে ২৫৫ রানের পাহাড়ে উঠে বসে ভারত। জবাবে মাত্র ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায় কিউইরা।
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিততে পেরে আনন্দের সীমা নেই হার্দিকের। ম্যাচ শেষে সেই অনুভূতিরই জানান দেন ভারতের তারকা অলরাউন্ডার।
“(ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতা) এটি অনেকটা ইমোশনাল। কারণ ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ জেতা, সবার উত্তেজনা, রোমাঞ্চ অসাধারণ। এখন মনে হচ্ছে আমরা সহজেই জিতে গিয়েছি। কিন্তু আমরা যে এফোর্ট দিয়েছি... গতকাল থেকেই আমি জানতাম যে, আমরা চ্যাম্পিয়ন।”
গত তিন বছরের মধ্যে হার্দিকের এটি তৃতীয় আইসিসি ট্রফি। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। আর ২০২৫ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়েই ট্রফি ঘরে তুলেছিল তারা।
এবার আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে হার্দিক জানিয়েছেন, অন্তত ১০টি শিরোপা জিততে চান তিনি।
“আমার মধ্যে আরও ১০ বছর বাকি আছে ক্রিকেট খেলার। আমার অর্ধেক ক্যারিয়ার শেষ। আরও অর্ধেক বাকি আছে। আমি অন্তত ১০টি শিরোপা জিততে চাই, আইসিসি ও আইপিএল মিলিয়ে। তবে আমার জন্য আইসিসি ট্রফির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।”
“আমি এরই মধ্যে ৩টি ট্রফি জিতেছি। সামনে যে টুর্নামেন্টই খেলব, আমি জিততে চাই। তো আমি মনে করি, সামনের ১০ বছরে আরও অন্তত ৫-৬টি শিরোপা আসবে। এটিই আমার লক্ষ্য।”