
টেস্ট ক্রিকেটে চাপের মুখে ব্যাটিং করাটা সবসময়ই কঠিন একটি কাজ। আর সেটা যদি হয় ৩০ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারানোর মত ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর, তাহলে সেখান থেকে খুব ভালো কিছু করা হয়ে ওঠে দুরূহ ব্যাপার। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই কাজটা বারবার করে যাচ্ছেন লিটন দাস। চাপের মুখেই যেন বেশি হাসছে তার ব্যাট। এর রহস্য কী? অভিজ্ঞ এই ব্যাটার জানালেন, কঠিন পরিস্থিতেই রান করার সুযোগ বরং বেশি দেখেন তিনি।
পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬ উইকেটে ২৬। সেখান থেকে স্কোর শেষ পর্যন্ত যায় ২৬২ পর্যন্ত, যেখানে বড় অবদান রাখেন লিটন। একপ্রান্ত আগলে খেলেন ১৩৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। সেখানে ডিফেন্ড যেমন করেছেন, তেমনি পরিস্থিতি অনুযায়ী আগ্রাসী শটও খেলেছেন বেশ। শুধু এই ইনিংসেই নয়, এর আগেও ৬-৭ নম্বরে নেমে প্রচণ্ড চাপের মুখে দারুণ সব ইনিংস খেলার কীর্তি গড়ার রয়েছে লিটনের।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সব পেসারই নাহিদের আদর্শ
মঙ্গলবার টি-স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিটন তার এসব ইনিংস খেলার শক্তি ও বিশ্বাসের জায়গা তুলে ধরেছেন। “মোটিভ কিছু না, আমার কাছে মনে হয় এটা খুব ভালো একটা সুযোগ। সবসময়ই আমি এটা অনুভব করি, ২৬ রানে ৬ উইকেট, ৫০ রানের আগে ৬ উইকেট, এমন সময়ে বোলিং দল অনেক আক্রমণ করে, এটাই স্বাভাবিক। আমার কাছে এটাই একটা সুযোগ মনে হয় যে এখানে একটা মারলেই চার হয়ে যাবে। চেষ্টা করি সেখানে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে ব্যাটিং করার। অনেক সময় দেখা যায় আপনি ইতিবাচকভাবে ব্যাটিং করলে ব্যাটের কানায় লেগেও বল গ্যাপ দিয়ে চলে যায়। তাই আমি সেটাই করার চেষ্টা করি। ওই অবস্থা থেকে বের হওয়ার দুইটা উপায়, হয় আপনাকে খুব ভালোভাবে টিকে থাকতে হবে, আর নাহলে আক্রমণ করে খেলতে হব। কারণ রানের চাকা সচল হলে স্পিল সরে যাবে, বোলার রান আটকানোর চেষ্টা করবে। আর তখন ভালো বলের সংখ্যা কমে আসবে। আমার কাছে এটাই মনে হয়।”
গত পাঁচ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে স্পেশালিষ্ট উইকেটরক্ষক-ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন লিটন। চাপের মুখে জ্বলে ওঠার পাশাপাশি তাতে ফুটে ওঠে এই ফরম্যাটে তার ধারাবাহিকতার দিকটিও। তিন ফরম্যাট বিবেচনা করলেও দেখা যায়, টেস্টেই লিটন সবচেয়ে ভালো করছেন এবং এখানে তার ধারাবাহিকতাও অনেক বেশি।

লিটনও বললেন, টেস্ট ক্রিকেটটা বিশেষভাবে উপভোগও করছেন তিনি। “আমি আসলে এগুলো (রেকর্ড) দেখিনি। আমি টেস্ট ক্রিকেটটা খুব উপভোগ করছি। অনেক আগে থেকেই করতাম। খেলতে চাই অনেকদিন, কারণ আমার কাছে মনে হয় এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমি এটা খুব উপযোগ করি। আসলে এভাবে কখনও চিন্তা করিনি যে আমার তিন-চার বছরে আমার গড় এত হচ্ছে। আমি শুধু এটাই চিন্তা করি যে ব্যাটিংয়ে আমার দলকে আরও বেশি কিছু দেওয়া যায়। সবসময় ১০০-১৫০ রান হয়ত হবে না, তবে ৫০ রান করলেও যেন এটার একটা প্রভাব থাকে, এটা নিয়েই আমি কাজ করছি।”
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজে ব্যাট হাতে দারুণ খেলার কারণে আসছে ভারত সিরিজেও লিটনকে নিয়ে সবার আশা অনেকটাই বেড়ে গেছে। আগে-পরে এই দলটির বিপক্ষে তার রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু ইনিংসও। যার মধ্যে রয়েছে ২০১৮ এশিয়া কাপের ফাইনালে করা সেঞ্চুরি, যা অনেকের চোখেই লিটনের অন্যতম সেরা ইনিংস।
তিনি নিজেও শোনালেন ভারত সিরিজ নিয়ে বড় স্বপ্নের কথা। “মানুষ তো আশা নিয়েই বুক বাঁধে। আমি তো আশা করব যেন আমি দুইটা টেস্টের দুইটাতেই ভালো খেলতে পারি। কারণ কঠিন হবে। তাদের দলে কোয়ালিটি বোলিং লাইনআপ আছে। কন্ডিশন তাদের পক্ষে, একটু কঠিন থাকবেই সবকিছুতে। তবে চেষ্টার কোনো কমতি থাকবে না। এখানে অনুশীলন আছে, ভারতেও আছে। চেষ্টা করব যতদূর সম্ভব খাপ খাইয়ে নিতে।”
No posts available.
১৬ মে ২০২৬, ১০:৫০ পিএম
১৬ মে ২০২৬, ৭:৫০ পিএম
১৬ মে ২০২৬, ৭:৪৩ পিএম

সংখ্যার খেরোখাতায় আর যাই হোক, সব ইনিংসের মাহাত্ম্য মাপা যায় না। সিলেট টেস্টে লিটন দাসের ১২৬ রানের ইনিংসটি তেমনই এক উদাহরণ। চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়ে দলকে টেনে তোলার অসামান্য বীরত্বে যে ধ্রুপদী প্রদর্শনী লিটন দেখিয়েছেন, তা এককথায় অনন্য অসাধারণ।
লিটনের ইনিংসের মাহাত্ম্য শুধু ২২ গজের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা মিলেমিশে একাকার হয়েছে এক বাবার গভীর আবেগে। ম্যাচ শেষে হেলমেটের লাল-সবুজ পতাকায় ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়ে, ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এই শতকটি লিটন উৎসর্গ করেছেন তাঁর ছোট্ট রাজকন্যা আনায়রাকে।
লিটন-সঞ্চিতা দম্পতির একমাত্র সন্তান আনায়রা দাস। পূজার সময় মাকে সেই ছোট্ট আনায়রা জিজ্ঞেস করেছিল, প্রার্থনায় কী চাইব? মা বলেছিলেন, বাবার সেঞ্চুরির জন্য প্রার্থনা করো। এরপর থেকে আনায়রার প্রার্থনা জুড়ে একটাই চাওয়া- বাবার সেঞ্চুরি। আর তাই, টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরিটি লিটন দাস উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রিয় কন্যাকেই। সিলেট টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষে এক আবেগঘন ফেসবুক বার্তায় ক্যারিয়ারের এই বিশেষ শতকটি মেয়ে আনায়রাকে উৎসর্গ করার ঘোষণা দেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার।
সামাজিক মাধ্যমে লিটন লেখেন, ‘শতকটি উৎসর্গ করলাম আমার রাজকন্যা আনায়রা দাসকে।’ এরপর তিনি যোগ করেন,
‘একবার এক পূজার আনুষ্ঠানিকতার সময় ও ওর মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ঈশ্বরের কাছে কী প্রার্থনা করা উচিত। আমার স্ত্রী তখন ওকে বলেছিল, “তোমার বাবার সেঞ্চুরির জন্য প্রার্থনা করো।” সেই থেকে ও ভগবানের কাছে শুধু আমার সেঞ্চুরির জন্যই প্রার্থনা করে আসছে।’
সিলেট টেস্টে প্রথম দিনে টসে হেরে ব্যাটিং নামা বাংলাদেশ ১১০ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে যখন খেই হারাতে থাকে, তখনই ব্যাট চওড়া হয়ে যায় লিটনের। লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের নিয়ে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়েন ডানহাতি এই ব্যাটার। তুলে নেন লাল বলের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ শতক।
২২ গজের এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের আগে ঘরে যে এমন এক মিষ্টি রূপকথা অপেক্ষা করছিল, তা হয়তো অনেকেরই জানা ছিল না। লিটনের সেই বিশেষ সেঞ্চুরির পেছনে লুকিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট মেয়ের এক অটল ও সরল বিশ্বাস। ম্যাচের আগের মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে তিনি তুলে ধরেন তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের সেই মধুর কথোপকথন,
‘আজ ম্যাচের আগেও ওর মা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'বাবা আজ কী করবে?' একটুও না ভেবে ও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়—'সেঞ্চুরি।' এমনকি ও আজ টিভিতে ম্যাচটি দেখেছে এবং হেলমেটে থাকা বাংলাদেশের পতাকায় আমার চুমু খাওয়ার দৃশ্যটি ও ভীষণ পছন্দ করেছে ।’
মেয়ের সেই সরল চাওয়া আর অটল বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পেরে একজন বাবা হিসেবে লিটনের বুকটা আজ যেন গর্বে ভরে উঠেছে। আগামী দিনেও ‘রাজকন্যার’ জন্য ব্যাটের এই ধার বজায় রাখার এক মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিটন লিখেছেন,
‘আমার ছোট্ট রাজকন্যা, এই সেঞ্চুরিটি শুধু তোমারই জন্য। আশা করি, আগামীবছরগুলোতে তোমাকে এমন আরও অনেকসেঞ্চুরি উপহার দিতে পারব।’

সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের শুরুটা বেশ ছন্নছাড়া। ১১৬ রানে নেই ৬ উইকেট। দুই শর মধ্যে গুটিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছিল। তখনও উইকেটে আস্থার প্রতীক হয়েছিলেন লিটন কুমার দাস।
ব্যাটিং বিপর্যয়ে কি করা উচিত, সেটি ভালো করেই জানেন অভিজ্ঞ লিটন। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে প্রথম দিনের বাকি অংশ এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটারেরই। ১৫৯ বলে ১২৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। যার সৌজন্যে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ তুলেছে ২৭৮ রান।
টেস্ট ব্যাটিং বিপর্যয়ের দলের চালক হওয়া যেন লিটনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাওয়ালপিন্ডি কিংবা মিরপুর—‘ক্রাইসিস মোমেন্টে’ একের পর এক অসাধারণ ইনিংস খেলে দলকে বাঁচিয়েছেন। আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরির পর লিটন জানিয়েছেন, বিপর্যয়ে দলকে প্রত্যাশিত ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়াই তাঁর আনন্দ।
২০২২ সালে মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ, সেখান থেকে ১৪১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলে দলকে ভালো অবস্থা নিয়ে যান লিটন। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল, ধ্বংস্তুপে দাঁড়িয়ে সেবার খেলেছিলেন ১৩৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস।
টেলএন্ডারদের নিয়ে চাপের মুখে খেলা, মিরপুর ও রাওয়ালপিন্ডির সেঞ্চুরির সঙ্গে আজকের ইনিংসের তুলনা করতে গিয়ে লিটন বলেন,
‘দুটা জিনিস হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যে ইনিংসটা ছিল ওটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ মুশফিক ভাইয়ের সঙ্গে জুটি ছিল। একজন ব্যাটার যখন আপনার পার্টনার থাকবে, মানিসকভাবে পরিস্কার থাকা যায়। রাওয়ালপিন্ডিতেও একই ছিল, মিরাজ একজন ব্যাটার অনেকক্ষণ ইনিংস অলমোস্ট আমার ৮০ রানের মতো ছিল ২০ রান আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। বাট আজকেরটা টোটালি ডিফারেন্ট।’
সেঞ্চুরি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে লিটন স্পষ্ট করে বলেন,
‘আমি মনে হয় যখন দুই বা তিন রানে তখন তাইজুল ভাই স্ট্রাইকে আসে। সেঞ্চুরি এটা মানুষ বলে কয়ে করতে পারে না আর এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিতও না যে সেঞ্চুরি করা লাগবে। আমার টার্গেট ছিল যে রানটা কীভাবে বোর্ডে আসে। কারণ যে সময়টাতে তাইজুল ভাই আসছে আমাদের বোর্ডে রান মাত্র ১১০ কি সামথিং ১৬। হ্যাঁ, ১৬। তো আমার টার্গেট ছিল যে কীভাবে টিমকে একটা ২০০ রান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়। অবশ্যই টার্গেট আমাকেই ফিলাপ করতে হবে। আমার টেল তো রান করবে না, রান আমাকেই করতে হবে। তো আমি একটা ইনফরমেশন পাঠিয়েছিলাম যে আমরা কি অ্যাটাকিংয়ে যাব কি না জাস্ট। উপর থেকে বলেছে রানের জন্য খেলার জন্য তো আমি চেষ্টা করেছি রান করার।’
দলের কঠিন পরিস্থিতিতে বারবার দায়িত্ব নেওয়া এবং এই ক্রাইসিস মোমেন্টগুলো লিটন বেশি উপভোগ করেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে লিটন জানান, পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জটা তিনি নিজের মতো করে নিতে ভালোবাসেন।
বললেন,
‘না না, আমি বললাম তো আমার রোলটাই ডিফারেন্ট। দেখবেন কোনো কোনোদিন টপ অর্ডার উপর থেকে রান করতেছে। আমি ব্যাটিং করতেছি ৬০-৭০ ওভারের সময় নামলাম উইকেটে বল ঘোরা শুরু হলো। আমার ক্রিকেটটাই এমন, আমাকে পার্টিকুলার যে সময়টা আসবে সে সময়টা এনজয় করে খেলা। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এখানেও এনজয় করার অনেক কিছু ছিল।’

লেজের দিকের ব্যাটারদের নিয়ে স্কোরবোর্ডে যোগ করলেন ১৮০ রান। ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংসে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছেন। মাঝেমধ্যেই তাসকিন আহমেদ-শরিফুলদের স্ট্রাইক না দিতে সিঙ্গেল নেননি। তবে হঠাৎ লিটন দাসের অসাধারণ এই ইনিংস ‘পূর্ণতা’ না পাওয়ার একটা শঙ্কাও জাগে। লিটনের ৯৯ রানের সময় অলআউট হতে পারত বাংলাদেশ। ওই পরিস্থিতিতে কি চিন্তা করছিলেন তিনি? হার্টবিট তো বেড়েই যাওয়ার কথা!
সিলেট টেস্টে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে উদ্ধার করা লিটন মিস করতে পারতেন সেঞ্চুরি। শতক থেকে এক রান দূরে থাকতে ১০ নম্বর ব্যাটার হিসেবে নামা শরিফুল পড়েন এলবিড্লুর ফাঁদে। পাকিস্তানের স্পিনার সাজিদ খানের বল লাগে শরিফুলের পায়ে আম্পায়ারের আঙুলও উঠে গেল! তবে মুহূর্তেই রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন শরিফুল। বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা গেল বলটি লেগ স্টাম্প লাইনের বাইরে দিয়ে চলে যাচ্ছে, ফলে বেঁচে গেলেন শরিফুল! পাশপাশি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ১২৬ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলা লিটনও।
৭০ ওভার পুরোটাই খেলতে হয়েছে শরিফুলকে। ওই মুহূর্তে শরিফুল আউট হলে ১১ নম্বর ব্যাটার নাহিদ রানাও দ্রুত ফিরতে পারত, তাতে সেঞ্চুরি হাতছাড়া হতে পারত লিটনের। তখন কি চলছিল উইকেটকিপার ব্যাটারের মনে? সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আসা লিটনের মুখ থেকেই শোনা যাক,
‘আমি অনেক টেনশনে ছিলাম, বিশেষ করে যখন শরিফুলের পায়ে লাগছে আরকি। আমি ওরে বারবার গিয়ে বলতেছিলাম যে সামনে খেলার জন্য কারণ ও তো অনেক লম্বা, সো ব্যাক অফ দ্য লেংথে গেলেই বলটা পায়ে লাগার চান্স বেশি। কিন্তু ও খুবই ভালো সাপোর্ট দিয়েছে।’
সিলেটের উইকেটে পাকিস্তানের স্পিনার সাজিদ খানের বিপক্ষে লোয়ার-অর্ডার ব্যাটারদের আগলে রাখাটা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শেষ দিকে দলের টেল-এন্ডারদের ব্যাটিং সামর্থ্যের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিলেন না লিটন, যার কারণে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন তিনি। শেষ ব্যাটারদের সামলানোর সেই স্নায়ুচাপের মুহূর্ত নিয়ে লিটন দাস বলেন,
‘ওই যে আমি বললাম যে আমার টেল-এন্ডারগুলো তো অতটা ভালো না যে আমি কনফিডেন্স সহকারে দিয়ে দিতে পারব ছয় বলের জন্য। তাই একজনকে দিয়েছিলাম সে প্রথম বলেই আউট হয়ে গেছে। সো ওর পরে আমি আরও নিজে সতর্ক হয়ে গেছি যে খেলা আমারই লাগবে আর যত কম দেওয়া যায় আরকি এক-দুই বল।’
লিটনের ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ দুর্দান্ত ইনিংসই এসেছে দলের চরম বিপর্যয়ের মুখে। বিশেষ করে টেস্টে দলের কঠিন পরিস্থিতি কি লিটন বাড়তি উপভোগ করেন? এমন প্রশ্নের মুখে নিজের ব্যাটিং পজিশন ও ভিন্ন ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দেন এই স্টাইলিশ ব্যাটার। লিটন জানান, পরিস্থিতির ওপর তাঁর হাত না থাকলেও নিজের অর্পিত দায়িত্বটা তিনি সবসময় উপভোগ করার চেষ্টা করেন।
উইকেটের পরিস্থিতি আর ম্যাচের অবস্থান অনুযায়ী লিটনের দায়িত্বটা একেক সময় একেক রূপ নেয়, যেখানে কখনো টপ-অর্ডারের তৈরি করা ভিতে রান বাড়াতে হয়, আবার কখনো ৬০-৭০ ওভার পর পুরোনো ও টার্নিং বলের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। বৈচিত্র্য এই দায়িত্বই উপভোগ করেন লিটন, ‘দেখবেন কোনো কোনোদিন টপঅর্ডার উপর থেকে রান করতেছে। আমি ব্যাটিং করতেছি ৬০-৭০ ওভারের সময় নামলাম উইকেটে বল ঘোরা শুরু হলো। তো আমার ক্রিকেটটাই এমন যে আমাকে নির্দিষ্ট সময়টা আসবে সে সময়টাএনজয় করে খেলা। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ কিন্তু এখানেও উপভোগের অনেক কিছু ছিল।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের পঞ্চম রাউন্ডে দারুণ ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির স্বাদ পেয়েছেন মোহাম্মদ মিঠুন, শাহাদাত হোসেন দীপু, আশিকুর রহমান শিবলি। বল হাতে কারিশমা দেখিয়ে ৬ উইকেট পেয়েছেন আব্দুল গাফফার সাকলাইন।
মোহামেডানকে হারিয়ে শীর্ষে প্রাইম ব্যাংক
বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্স মাঠে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে শেষ ওভারে গিয়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে ৩ উইকেটে হারিয়েছে প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। পাঁচ ম্যাচের সবকটি জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে গেছে তারা। প্রথম পরাজয়ে দুইয়ে নেমে গেছে মোহামেডান।
মাত্র ১ রানের জন্য সেঞ্চুরি করতে পারেননি মোহাম্মদ নাঈম শেখ। তার ১০৭ বলে ৯৯ রানের সঙ্গে পারভেজ হোসেন ইমন ৫২ ও আফিফ হোসেন ধ্রুব ৪৯ রানের ইনিংস খেললে ৬ উইকেটে ৩০৩ রান করে মোহামেডান। আবু হাশিম নেন ৪ উইকেট।
রান তাড়ায় চমৎকার সেঞ্চুরি করেন শাহাদাত। তার ব্যাট থেকে আসে ১০ চার ও ২ ছক্কায় ১২৩ বলে ১১৮ রান। এছাড়া আকবর আলি ৩০ বলে ৪০ ও শামীম হোসেন পাটোয়ারী ২১ বলে ৩৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললে শেষ ওভারে গিয়ে জিতে যায় প্রাইম ব্যাংক। সাইফ উদ্দিন নেন ৪ উইকেট।
আবাহনীর হ্যাটট্রিক জয়
পরপর দুই ম্যাচ হেরে যাত্রা শুরুর পর টানা তৃতীয় জয় পেল আবাহনী লিমিটেড। মিরপুরে বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্সকে ৬ উইকেটে হারাল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২০৯ রান করতে পারে বসুন্ধরা। জবাবে ৩৯.২ ওভারে জিতে যায় আবাহনী।
পাঁচ ম্যাচে তিন জয়ে টেবিলের তিন নম্বরে আবাহনী। সমান ম্যাচে দুই জয়ে বসুন্ধরার অবস্থান নবম।
বসুন্ধরার পক্ষে সর্বোচ্চ ৮১ রান করেন আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। এছাড়া নাহিদুল ইসলামের ব্যাট থেকে আসে ৬৩ রান। দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৯ ওভারে ২ মেডেনসহ মাত্র ৩৪ রানে ৪ উইকেট নেন তরুণ পেসার রোহানাত দৌল্লাহ বর্ষণ।
রান তাড়ায় আবাহনীর হয়ে ৩ চার, ৫ ছক্কায় দলের সর্বোচ্চ ৫৭ রান করেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। এছাড়া ৫৪ বলে ৫০ রানে অপরাজিত থাকেন সাব্বির রহমান। জাকের আলি অনিকের ব্যাট থেকে আসে ৪৩ রান।
মিঠুনের ৮ ছক্কার তাণ্ডব
ক্রিকেটার্স একাডেমি মাঠে ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে ৩ চার ও ৮ ছক্কায় ৮৬ বলে ১১২ রানের ইনিংস খেলেছেন ঢাকা লেপার্ডসের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন। এছাড়া মইন খানের ব্যাট থেকে এসেছে ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ৪৪ বলে ৬৯ রান।
এই দুজনের পাশাপাশি ইফতেখার হোসেন ইফতি ৫১ রানের ইনিংস খেলে ৩৫১ রানের পুঁজি পায় ঢাকা লেপার্ডস। জবাবে মাত্র ২৩১ রানের গুটিয়ে যায় ব্রাদার্স। গোলাম কিবরিয়া শাকিল করেন সর্বোচ্চ ৫১ রান। ১২০ রানের জিতে যায় লেপার্ডস।
পাঁচ ম্যাচে তিন জয় নিয়ে টেবিলের পাঁচ নম্বরে লেপার্ডস।
শিবলির সেঞ্চুরি, রূপগঞ্জের বিশাল জয়
বিকেএসপির ৪ নম্বর মাঠে গুলশান ক্রিকেট ক্লাবকে ২০৫ রানে হারিয়েছে লেজেন্ডস অব রূপগঞ্জ। আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ৩৫৪ রান করে রূপগঞ্জ। জবাবে ১৪৯ রানে গুটিয়ে যায় গুলশান।
পাঁচ ম্যাচে রূপগঞ্জের এটি তৃতীয় জয়। গুলশান জিতেছে এক ম্যাচ।
রূপগঞ্জের পক্ষে ১৩০ বলে ১১৯ রানের ইনিংস খেলেন আশিকুর রহমান শিবলি। এর আগে এক ম্যাচে ৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। এবার পেলেন প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদ।
এছাড়া রবিউল ইসলাম রবি ৭৩ বলে ৬৫ ও সামিউর বশির রাতুল ৩০ বলে করেন ৪৭ রান।
গুলশানের পক্ষে ৬৫ বলে ৬১ রান করেন শাহরিয়ার সাকিব। নাসুম আহমেদ ৩২ রানে নেন ৪ উইকেট।
সাকলাইনের ৬ উইকেট
বিকেএসপির ৩ নম্বর মাঠে রূপগঞ্জ টাইগার্স ক্রিকেট ক্লাবকে ৬ উইকেটে হারিয়েছে সিটি ক্লাব। আগে ব্যাট করে ৭ উইকেটে ২৪৬ রান করে রূপগঞ্জ টাইগার্স। জবাবে মাত্র ৩৯.৩ ওভারে জিতে যায় সিটি ক্লাব।
এটি তাদের তৃতীয় জয়। এখনও কোনো জয়ের দেখা পায়নি রূপগঞ্জ টাইগার্স।
প্রতিপক্ষের ৭ উইকেটের মধ্যে একাই ৬টি নেন আব্দুল গাফফার সাকলাইন। সব মিলিয়ে ১০ ওভারে ২ মেডেনসহ মাত্র ৩৭ রান খরচ করেন তিনি।
রূপগঞ্জের পক্ষে ১৪৪ বলে ১০৬ রানের ইনিংস খেলেন মাহমুদুল হাসান লিমন। এছাড়া আব্দুল মজিদ ৮৫ বলে ৫২ ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ৩৭ বলে করেন ৫০ রান।
রান তাড়ায় ৭ চার ও ৩ ছক্কায় ৯৫ বলে ১০৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন সাদিকুর রহমান। এছাড়া এনামুল হক এনামের ব্যাট থেকে আসে ১ চার ও ৮ ছক্কায় ৮৫ বলে ৯০ রান।
গাজী গ্রুপকে হারাল অগ্রণী ব্যাংক
পিকেএসপিতে গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সকে ৪ উইকেটে হারিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। প্রীতম কুমারের ৬২ বলে ৭২ রানের সৌজন্যে ২৫২ রানের পুঁজি পায় গাজী গ্রুপ। জবাবে ৪৮.৫ ওভারে জিতে যায় অগ্রণী ব্যাংক।
শুভাগত হোম ৬৭ বলে ৭৮ রান করে আউট হন। নাসির হোসেনের ব্যাট থেকে আসে ৭৯ বলে ৭৮ রানের অপরাজিত ইনিংস। সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে ম্যাচ সেরাও হন নাসির। অগ্রণী ব্যাংকের পক্ষে ৩৩ রানে ৪ উইকেট নেন আরিফ আহমেদ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হয়েছে। আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার আহসানুল করিম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তফসিল প্রকাশ করা হয়। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জুন বিসিবি নির্বাচন হবে।
নির্বাচনে তিনটি ক্যাটাগরিতে মোট ২৩ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন। এর মধ্যে ক্যাটাগরি-১ থেকে ১০ জন, ক্যাটাগরি-২ থেকে ১২ জন এবং ক্যাটাগরি-৩ থেকে ১ জন পরিচালক পদের জন্য ভোট গ্রহণ করা হবে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল বিকেল ৪টায় মিরপুরের বিসিবি কার্যালয় ও বোর্ডের ওয়েবসাইটে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এই তালিকার ওপর ১৮ মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আপত্তি গ্রহণ করা হবে এবং ১৯ মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আপত্তির ওপর শুনানি হবে। একই দিন বিকেল ৫টায় চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা আগামী ২০ ও ২১ মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে মিরপুর বিসিবি কার্যালয়ের রিটার্নিং অফিসারের কক্ষ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকার (অফেরতযোগ্য) বিনিময়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। সংগৃহীত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে ২১ ও ২২ মে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে।
২৩ মে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের বিরুদ্ধে আপীল গ্রহণ ও শুনানি হবে ২৪ মে। সেদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আপীল গ্রহণ এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শুনানি চলবে। ২৫ মে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা যাবে এবং একই দিন বেলা ২টায় প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
পোস্টাল বা ই-ব্যালটের ব্যবস্থা রয়েছে। ২৫ মে বাংলাদেশ সময় রাত ১২টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের রেজিস্টার্ড ই-মেইল থেকে নির্দিষ্ট ই-মেইল আইডিতে (bcbec2026@gmail.com) আবেদন করতে হবে। তারপর ১ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে ভোটারদের বর্তমান ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট এবং নির্ধারিত ই-মেইলে ই-ব্যালট প্রেরণ করা হবে। পূরণকৃত পোস্টাল ও ই-ব্যালট আগামী ৭ জুন দুপুর ১টার মধ্যে বিসিবি কার্যালয়ে বা নির্ধারিত ই-মেইলে পৌঁছাতে হবে, এর পরে প্রাপ্ত কোনো ব্যালট গ্রহণযোগ্য হবে না।
আগামী ৭ জুন মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের বিসিবি বোর্ড রুমে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে ওই দিনই সন্ধ্যা ৬টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।